logo

গুড নিউজ, ব্যাড নিউজ

  • August 16th, 2022
News

গুড নিউজ, ব্যাড নিউজ

সুমন চট্টোপাধ্যায়

নো নিউজ ইজ গুড নিউজ। সেই কবে থেকে শুনছি, আপনারাও নিশ্চয়ই শুনেছেন। এর গূঢ় অর্থটি হল, খবর মানেই দুঃসংবাদ, কোনও খবর না থাকার মানে কোনও দুঃসংবাদ নেই। যাক বাবা বাঁচা গেল!

যা স্বাভাবিক সেটা খবর নয়, খবর সেটাই যা অস্বাভাবিক, নঙর্থক, চক্ষু চড়ক গাছে তোলার মতো। এজন্যই বলা হয়ে থাকে, কুকুর মানুষকে কামড়ালে সেটা খবর নয়, উল্টোটা যদি ঘটে তবেই সেটা খবর। যদিও মানুষ কুকুরকে কামড়েছে এমন কোনও এক্সক্লুসিভ আজ পর্যন্ত কোনও মিডিয়া করতে পারেনি। করে থাকলেও আমার জানা নেই।

এ ব্যাপারে আমাদের সবার মধ্যেই কম-বেশি ভণ্ডামি আছে। আমরা মুখে যা বলি, মনে মনে আসলে তা চাই না। চারদিকের ‘নেগেটিভিটি’ মিডিয়ায় দৈনন্দিন ভাবে প্রতিফলিত হয়, আমরা ভাব দেখাই এ সব আমাদের বিলকুল না-পসন্দ, খুন-ধর্ষণ-হানহানি-যৌনতার খবরকে এতটা গুরুত্ব দিয়ে মিডিয়া সমাজের সর্বনাশ করে চলেছে অনবরত। অথচ মিডিয়ার অন্দরমহলে দীর্ঘকাল ঘানি টানার সুবাদে জানি, এই সব খবরই পাঠক বেশি পছন্দ করেন, অন্তত সংখ্যাতত্ত্বে সেটাই বছরের পর বছর প্রমাণিত। নেগেটিভ খবরকে ভুলে গিয়ে কোনও কাগজ যদি সুবোধ বালক হতে চায়, তাহলে এক সপ্তাহের মধ্যে নির্ঘাত তার গণেশ ওল্টাবে।

এই প্রসঙ্গে একটি মজার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার কথা বলি। সরকার বাড়িতে থাকাকালীন আমরা নিয়ম করে পাঠকসভা করতাম গোটা রাজ্য ঘুরে ঘুরে। আনন্দবাজার সম্পর্কে কে কী ভাবছে, কী কী তাদের প্রধান অভিযোগ, প্রত্যাশাগুলোই বা কী, চক্ষু-কর্ণের বিবাদ ভঞ্জন করে তা বোঝার চেষ্টা করা। প্রতিটি পাঠকসভায় অবধারিত ভাবে সবচেয়ে বেশি গাল খেতেন রঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায়, তাঁর সম্পর্কে সকলের বক্তব্যের নির্যাসটুকু এক। আনন্দবাজারের মতো শ্রদ্ধেয় প্রতিষ্ঠান এই ধরনের পর্নোগ্রাফি লেখককে এত তোল্লা দেয় কেন? আপনাদের উচিত অবিলম্বে রঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখা ছাপানো বন্ধ করা। গালাগালের বহর শুনে বোঝা গেল রঞ্জনদার জনপ্রিয়তা, লোকটা তার মানে সুপার-হিট।

মুর্শিদাবাদের কান্দিতে শুনতে হল অন্য অভিযোগ। আনন্দবাজারে ইদানিং স্বল্পবসনা নারীর যে সব ছবি প্রকাশিত হয়, অবিলম্বে তা বন্ধ করা দরকার। নিজের আসন ছেড়ে দাঁড়িয়ে উঠে, গলা সপ্তমে চড়িয়ে, রীতিমতো মারমুখী ঢঙে যে ভদ্রলোক লম্বা লেকচার দিলেন তিনি পেশায় স্কুল শিক্ষক। ভদ্রলোকের কথাবার্তা বলার ধরন এতটাই আপত্তিকর, আমার গা রি রি করতে লাগল। অথচ কিচ্ছুটি করার উপায় নেই, পাঠক হল লক্ষ্মী, তাকে চটানো যাবে না কিছুতেই।

সভা শেষে এক প্রান্তে দাঁড়িয়ে মাটির ভাঁড়ে চা খাচ্ছি, সেই অসভ্য ভদ্রলোক আমাকে দেখে এগিয়ে এলেন। ভয় হল, এ বার ক্যালাবে-ট্যালাবে না তো? না, এখন তিনি অন্য চেহারায়, হাসিতে গদগদ, বিনয়ের অবতার। আমার হাত ধরে একটু দূরে টেনে নিয়ে গিয়ে বললেন, ‘আমার কথায় আপনারা আঘাত পাননি তো? আমার হয়তো অতটা উত্তেজিত হয়ে এ সব কথা বলা উচিত হয়নি।’

‘না, না, একেবারেই কিছু মনে করিনি। কাগজ সম্পর্কে আপনাদের অভাব-অভিযোগ শুনতেই তো আমরা এসেছি। আপনার কথা আপনি বলেছেন, আমরা নোট করে নিয়েছি।’

এরপরেই গপ্পে এলো নাটকীয় মোড়। ‘আসল কথাটা কি জানেন সুমনবাবু, ওই ছবিগুলো দেখতে আমার নিজের বেশ লাগে। তবে বাড়িতে বাচ্চা ছেলেমেয়েদের নিয়ে থাকতে হয় তো, কাগজটা তাই লুকিয়ে রাখতে হয়।’

এই গপ্পো কি কম-বেশি আমাদের ক্ষেত্রেও একই রকম প্রযোজ্য নয়?

আজকাল অবশ্য মিডিয়ায় ক্ষীণ ভাবে হলেও আত্ম-সংশোধনের একটা তাগিদ দেখা যাচ্ছে। ছাপা হচ্ছে ‘গুড নিউজ’। মানে এমন খবর যা পড়লে আপনার মনটা চনমন করে উঠবে, ক্ষণিকের জন্য হলেও আপনি বলে উঠবেন, ‘বাঃ বেশ তো’। পশ্চিমি মিডিয়ায় সুখবর ছাপানো এখন নৈমিত্তিক ব্যাপার, ইন্টারনেটেও এমন গুড নিউজ পোর্টালের ছড়াছড়ি।

এ সবের বাইরেও এমন কিছু খবর থাকে যার গায়ে ভালোর লেবেল সেঁটে দিতে হয় না, পড়লে এমনিতেই মনটা ফুরফুরে লাগে, সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের ওপর আস্থা বাড়ে, বিশ্বাস করতে ইচ্ছে হয়, সমাজে প্রগতির অভিমুখটি তাহলে ঠিকই আছে।

দিল্লি হাইকোর্টের বিচারপতি হিসেবে সৌরভ কৃপালের নির্বাচন তেমনই একটি খবর। সৌরভ ঘোষিত সমকামী, নিজের ভাষায়, ‘অ্যান অ্যাক্সিডেন্টাল গে অ্যাকটিভিস্ট।’ সমকামকে অপরাধের তালিকামুক্ত করার আন্দোলনে সৌরভ প্রথম সারিতে ছিলেন। ৩৭৭ খারিজের মামলায় তিনি জান দিয়ে লড়েছিলেন আবেদনপ্রার্থীদের হয়ে। এর পরেই তাঁর সম্পাদনায় একটি চমৎকার বই প্রকাশিত হয় যার শিরোনাম ‘সেক্স অ্যান্ড সুপ্রিম কোর্ট’।

সৌরভের যোগ্যতা নিয়ে কোনও প্রশ্ন নেই। তাঁর বাবা অল্প সময়ের জন্য হলেও সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি হয়েছিলেন। সেন্ট স্টিফেন্স কলেজে সৌরভের বিষয় ছিল পদার্থ বিজ্ঞান। তারপরেই আইন পড়তে তিনি ভর্তি হন অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে। স্নাতোকোত্তর উত্তীর্ণ হন, কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। দেশে ফিরে আজ দু’দশক হয়ে গেল সৌরভ দিল্লি হাইকোর্ট আর সুপ্রিম কোর্টে প্র্যাকটিস করছেন। দিল্লি হাইকোর্টে সিনিয়র অ্যাডভোকেট হওয়ার জন্য সৌরভের নাম যখন প্রস্তাবিত হয়, ৩১ জন বিচারপতির মধ্যে ৩১ জনই এক বাক্যে তা অনুমোদন করেছিলেন।

সৌরভের হাইকোর্টের বিচারপতি হওয়ার বিষয়টি ঝুলে আছে ২০১৮ সাল থেকেই। সুপ্রিম কোর্টের কলেজিয়াম তাঁর নাম সুপারিশ করলেও কেন্দ্রীয় সরকার আপত্তি জানায় এই কারণ দেখিয়ে যে সৌরভের পার্টনার বিদেশি, সুইস দূতাবাসে কাজ করেন, ফলে জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্নটি উড়িয়ে দেওয়া যাবে না। সেই থেকে ঝুলেই ছিল সৌরভের নিয়োগের বিষয়টি। শেষ পর্যন্ত গত সোমবার ১৫ নভেম্বর প্রধান বিচারপতি রামান্নার নেতৃত্বে তিন সদস্যের কলেজিয়াম সাহসী সিদ্ধান্ত নিয়ে ফের সুপারিশ পাঠিয়েছে সরকারের কোর্টে। একবার সরকারি সিলমোহর লেগে গেলে সৌরভ তৈরি করবেন নতুন ইতিহাস, তিনিই হবেন দেশের কোনও হাইকোর্টের প্রথম সমকামী বিচারপতি। সামাজিক অগ্রগতির রাস্তায় তৈরি হবে নতুন মাইল ফলক।

Leave a comment

Your email address will not be published.