logo

চুম্বন-মাহাত্ম্য

  • August 16th, 2022
Suman Nama

চুম্বন-মাহাত্ম্য

সুমন চট্টোপাধ্যায়

‘Kiss me and see how strong I am’.

না রমণীকুলের কাউকে আমি আহ্বান জানাচ্ছি না। দিনকাল এতই খারাপ যে আমি বিরাট কেস খেয়ে যেতে পারি, ‘মি টু’-তে ফেঁসে যেতে পারি, কোনও বেরসিকা সটান লালবাজারের সাইবার ক্রাইমে গিয়ে আমার নামে ফার্স্ট ইনফরমেশন রিপোর্ট রুজু করে দিতে পারেন, পুলিশ মাঝরাতে কলিং বেল বাজিয়ে আমায় তুলে নিয়ে গিয়ে লক আপে সটকে দিতে পারে, আমি রোদ্দুর রায় হয়ে যেতে পারি, একই কারণে রাজ্যের কোনায় কোনায় থানায় থানায় আমার নামে একটা করে অভিযোগ জমা পড়তে পারে, একটা মামলায় জামিন পেয়ে আর একটা মামলায় ঢুকে যেতে পারি, তারপর আর একটা মামলায় তারপর আরেকটা.....। আমার নিগ্রহের কারণ গোপন থাকবে না, ক্যামেরা আর বুম হাতে ছেলেপিলেগুলো আদালত চত্বরে কোটালের বান ডাকতে পারে, চ্যানেলে চ্যানেলে প্রাইম টাইমে বিজ্ঞজনদের ডেকে এনে আমার চরিত্রের ব্যবচ্ছেদ শুরু হতে পারে, কেউ বলতে পারেন আহা এটা কিন্তু লঘু পাপে গুরুদণ্ড, কেউ আবার ফোঁস করে উঠতে পারেন — আপনারা কেউ কিচ্ছু জানেন না মশাই। চুমু খেতে খেতেই বজ্জাত লোকটা চুল পাকিয়ে ফেলেছে, বেশ হয়েছে।

লোকটার একটা জব্বর শিক্ষা হওয়া দরকার। ভাবতে পারেন একটা ঘাটের মড়া, আজ বাদে কাল খই ছড়াতে ছড়াতে চুল্লিতে গিয়ে উঠবে, এখনও বলছে কি না  চুমু খাও, বুঝবে আমি কতটা শক্তিশালী। আরে বাবা তুই কবে থেকে সলমান খান হয়ে গেলি রে! 

তখন কেউ বুঝবে না, জানতেও চাইবে না, এই দম্ভ আমি দেখাচ্ছি না, দেখিয়েছিলেন সিলভিয়া প্লাথ। ব্রাত্য বসুর সেমসাইড নিয়ে আমার লেখাটি সূর্যের আলো দেখার পর থেকে এই বিশ্ববরেণ্য মহিলা কবিকে নিয়ে কিঞ্চিৎ কৌতূহলের সঞ্চার হয়েছে। দেখতে পাচ্ছি, কেউ কেউ আলতো করে জানতে চাইছেন দাদা সিলভিয়া প্লাথটা কে?

গুগল পাঠশালায় ঢুকে পড়ুন, কৌতূহল নিরসন করুন, আমি ইতিহাসে পাতিহাঁস, কবি-কাব্য-কাব্যচর্চার থেকে আমার অবস্থান কয়েক আলোকবর্ষ দূরে। গতকাল ছিল ‘আন্তর্জাতিক চুম্বন দিবস’, হঠাৎ ইন্টারনেটে দেখে ওই বিখ্যাত পংক্তিটি মনে পড়ে গেল এই যা, তাই উগরে দিলাম। পাণ্ডিত্য জাহির করতে বোকারা যা করে থাকে!

আন্তর্জাতিক চুম্বন দিবসকে আবার ভ্যালেনটাইনস ডে-র সঙ্গে গুলিয়ে ফেলবেন না। প্রথমটি ঝরনার জল হলে দ্বিতীয়টি রেড়ির তেল। প্রথমটি রাজকীয়, দ্বিতীয়টি প্লেবিয়ান। প্রথমটি শাশ্বত, দ্বিতীয়টি হুজুগ। প্রথমটি আসে নারী-পুরুষের গভীর প্রেমের অনুষঙ্গে, দ্বিতীয়টি নেহাতই ছ্যাবলামি। প্রথমটি অমর, অজেয়, জীবনে, সাহিত্যে, কাব্যে সদা-বন্দিত, দ্বিতীয়টি দো দিনকা মাদারির খেল। প্রথমটি অমৃত, দ্বিতীয়টি গরল। সে যাই হোক, তথ্যের খাতিরে বলি, এই চুম্বন দিবস প্রথমেই আন্তর্জাতিকতার কৌলীন্য পায়নি। শুরু হয়েছিল ইংল্যান্ডে তারপরে চুম্বন কি কামাল।

চুম্বনের অমরত্বের কথা আমার মতো দু’পয়সার সাংবাদিক (মহুয়া মিত্রকে মনে পড়ে?) প্রথম বলল তা নয়। বলেছিলেন গল্পের জাদুকর মপাসাঁ। ‘চুম্বন ওষ্ঠ থেকে ওষ্ঠে ঘোরে, শতাব্দী থেকে শতাব্দী, যুগ থেকে যুগান্তরে। Men and women garner these kisses, offer them to others and then die in turn.” মানে বেদান্তের ট্রান্সমিউটেশন অব সোল হয় কি হয় না বলতে পারব না, চুম্বন কিন্তু মৃত্যুহীন, অবিনশ্বর (অনেকটা সিপিএম পণ্ডিতদের ব্যাখ্যায় মার্কসবাদের মতো)।

চুম্বনেরও এভলিউশন হয়, আলবাত হয়। আজকাল সিনেমা বা ওটিটির পর্দায় যে ঘিনঘিনে চুম্বন দেখতে আমরা অভ্যস্ত, কিছুকাল আগেও এই স্বর্গীয় অভিব্যক্তিটি এমন ছিল না। তাহলে ছিল কেমন? বিশদে বলতে পারব না, এটুকু অবশ্যই বলব তখন চুম্বনের মানে ছিল এমন এক স্পর্শ যার স্বাদ পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মনে হত, এই স্মৃতি জাগরুক থাকবে ততদিন যতদিন আমি জীবিত আছি। ‘Now a soft kiss— Aye by that kiss I vow an endless bliss’— জন কিটস।

চুম্বন দিবসে আসুন এক সে বড়কর এক কয়েকটি চুম্বন-আরাধনার উক্তি শোনাই — চুম্বন আসলে সেই গোপন কথা যা ওষ্ঠকে কর্ণকুহর মনে করে।

ইনগ্রিড বার্গম্যান- ‘চুম্বন আসলে প্রকৃতির সেই মধুর খেলা যা কথাকে এমন একটা সময়ে স্তব্ধ করে যখন কথা বলার আর কোনও অর্থই থাকে না।’ এত মিঠে করে বলতে পারেননি কোকো শ্যানেল। তাঁকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, সুগন্ধি মাখব কোথায়? তাঁর জবাব, শরীরের যেখানে চুম্বন করা যায় তার সর্বত্র। কাফকার চুম্বনস্পৃহা এক্কেবারে কাফকারই মতো —মে আই কিস ইউ দেন? অন দিস মিসারেবল পেপার? আই মাইট অ্যাজ ওয়েল ওপেন দ্য উইন্ডো অ্যান্ড কিস দ্য নাইট এয়ার। ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে বলেছিলেন কিনা বলতে পারবনা, অস্কার ওয়াইল্ড চুম্বনে ধ্বংসের অশুভ ছায়া দেখেছিলেন — এ কিস মে রুইন এ হিউম্যান লাইফ। বাকোয়াস।

চুম্বনের প্রসঙ্গ এলে আমার ভিক্টর হুগোর লা মিসারেবলের সেই মনে শূল বিদ্ধ করা দৃশ্যটি চোখের সামনে ভেসে ওঠে। মৃত্যুশয্যায় শুয়ে এপোনাইন, যে কোনও মুহূর্তে শেষ নিঃশ্বাসটুকু বের হবে, মারিয়সকে হঠাৎ সে বলে ওঠে, ‘মরার পরে আমার ভ্রু-যুগলে তোমার একটি চুম্বন এঁকে দিও, আমি বুঝতে পারব ঠিক।” একথা বলার সঙ্গে সঙ্গে মরিয়সের হাঁটুর ওপরে ঢলে পড়ে তার মাথা। মরিয়স মনে করে এপোনাইন আর নেই। যখন সে ভাবছে প্রণয়িনী চির ঘুমের দেশে ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে, হঠাৎ তার কানে আসে এপোনাইনের কথা, মনে হয় যেন জ্যোতিষ্কলোকের ওপার থেকে ভেসে আসা। ‘Monsieur Marius, I believe that I was a little bit in love with you’

মুখখানি তুলিয়ে চাও সুধীরে মুখখানি তুলিয়ে চাও/ সখী, একটি চুম্বন দাও, গোপনে একটি চুম্বন দাও। ব্যস, বাঙালির দম শেষ। পৃথিবী ঘুমিয়ে পড়লেই শুধু হবে না, আকাশের চাঁদ-তারাদেরও ঘুমিয়ে পড়তে হবে, তবে বীরপুঙ্গব পাশে এসে বসে একটি গোপন চুম্বন চাইবে। একটু সাহস দেখিয়েছ কি দেখবে  ‘দুয়ারে পুলিশ।’

Leave a comment

Your email address will not be published.