logo

বুদ্ধং শরণং (পর্ব-৮)

  • August 17th, 2022
Memoir

বুদ্ধং শরণং (পর্ব-৮)

সুমন চট্টোপাধ্যায়

আলিপুরের ভবানী ভবনে পৌঁছে আর্দালি মারফৎ খবর পাঠাতেই পার্থ ভট্টাচার্য সঙ্গে সঙ্গে আমাকে নিজের ঘরে ডেকে নিলেন। প্রশস্ত ঘর, কিন্তু পার্থবাবু নিজের চেয়ারে না বসে, বাঁদিকের একটা টেবিলের সামনে চুপটি করে দাঁড়িয়ে আছেন, পাশে একজন যুবা অফিসার। টেবিলের ওপরে একটা ছোট্ট যন্ত্র, অদ্ভুত আকারের, প্রফেসর শঙ্কুর ল্যাবরেটরিতেই মানাত বেশি। ওই যন্ত্রের ভিতর থেকে একটা কন্ঠ ভেসে আসছে, তরঙ্গের গন্ডগোলে ভালো শোনা যাচ্ছে না। আমিও একটু দূরে চুপ করে দাঁড়িয়ে পড়লাম।

ঊর্দু-মেশানো হিন্দিতে কথা বলছে ওপারের অশরীরী। গলায় যেমন তেজ তেমনি দাপট, তেমনি প্রায় প্রতিটি বাক্যের হয় শুরু নয়তো শেষে বাছাই করা কাঁচা খিস্তি। অন্যকে চমকে যাদের অন্নসংস্থান হয়, এই লোকটা দেখছি সেই পুলিশকে চমকাচ্ছে রীতিমতো খিস্তি-খাস্তা করে। ‘তোদের যা করার আছে করে নে, মাল না পাওয়া পর্যন্ত পার্সেল আমাদের কাছেই থাকবে। যদি বেশি দেরি করিস বাড়ির দরজায় লাশ নামিয়ে রেখে আসব।’ ব্যস হিরোর সংলাপ শেষ, নিজের চেয়ারে ফিরতে ফিরতে পার্থবাবু তাঁর যুবা সহকর্মীর সঙ্গে আলাপ করিয়ে দিলেন, 'এই ছেলেটিকে ভালো করে চিনে রাখো, এতক্ষণ ধরে যা কিছু শুনলে তা এর হাতযশের কারণেই সম্ভব হচ্ছে। দিস গাই ইজ এ জিনিয়াস, হি উইল গো ভেরি ফার ভেরি সুন, মার্ক মাই ওয়ার্ডস।'

রাজীব কুমার। ওই দিনের পরে তাঁর সঙ্গে আমার দু-একবার দেখা সাক্ষাৎ হয়ে থাকতে পারে, কিন্তু ওই পর্যন্তই। সারদা কেলেঙ্কারির তদন্তের কারণে কেরিয়ারের শেষ পর্বে এসে ভাবমূর্তি কিছুটা মলিন হলেও দক্ষতা ও পেশাদারিত্বের মানদণ্ডে রাজীবকে ফুল মার্কস দিয়ে থাকেন সবাই। দিল্লি পুলিশের প্রাক্তন কমিশনার নীরজ কুমারের বই ‘ডায়াল ডি ফর ডন’-এ অনেকখানি জায়গা জুড়ে রাজীবের ভূয়সী প্রশংসা করেছেন লেখক। বিশেষ করে খাদিম কর্তা অপহরণ আর আমেরিকান সেন্টারে আক্রমণের তদন্ত প্রসঙ্গে। সিবিআই-এর কর্তা হিসেবে নীরজ এই তদন্তের সঙ্গে জড়িত ছিলেন, তখনই সিআইডি-র এই এসএসপি-র কর্মকুশলতা, বিশেষ করে ইলেকট্রনিক সার্ভাইলেন্সের ব্যবহার মুগ্ধ করেছিল এই সিনিয়র অফিসারকে।

রাজীব তো হল। কিন্তু যে লোকটা দূর থেকে বিরাট রংবাজি আর খিস্তি-খেউড় করল, সেই হারামজাদাটি কে?

পার্থবাবুর মুখে নামটা শুনেই কয়েক সেকেন্ড থতমত খেয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম। এই তাহলে সেই মাস্টারমাইন্ড দুবাইয়ে বসে যে খাদিম কর্তা অপহরণের মূল ছকটা কষেছিল আর এখন মুক্তিপণ নিয়ে দর-কষাকষি করছে পুলিশের সঙ্গে?

আফতাব আনসারি। যা দেখলাম, শুনলাম তা যে লিখতে পারব না জানতাম। তবে আফতাবের নামটি যে উল্লেখ করতে পারি, পার্থবাবুর কাছে সেই অনুমতিটি চেয়ে নিলাম। পরের দিন সকলে জানল খাদিম কর্তা অপহরণের মূল-চক্রীর নাম ও পরিচয়। সেই শুরু এক্সক্লুসিভের পর এক্সক্লুসিভ। সৌজন্যে পার্থ ভট্টাচার্য। দিন দুয়েক পরে আমার যেন নেশা ধরে গেল খাদিম কর্তা অপহরণ রহস্যে।

বেনারসের কাছে লালপুরে বাড়ি আফতাব আনসারির। সারা দেশ থেকে রিপোর্টাররা সে সময় সেখানে ভিড় জমাতো খবরের আশায়। আফতাব সাংবাদিকতার স্নাতক যদিও মিডিয়ার কাজের সামান্য উপার্জন তাকে কখনও আকৃষ্ট করেনি। তবে দুবাইয়ে থাকাকালীন সে নিজেকে ‘টাইম’ আর ‘নিউজউইক’-এর প্রতিনিধি বলে পরিচয় দিত। পকেটে রাখত এই দুই বিশ্বখ্যাত ম্যাগাজিনের জাল পরিচয়পত্র। জেহাদ-টেহাদ নয়, তার জীবনের একমাত্র লক্ষ্য ছিল যেন তেন প্রকারেণ কোটি কোটি টাকা কামানো।

দুবাইয়ে বসে রিমোট কন্ট্রোলে পার্থ রায় বর্মনের অপহরণ সঞ্চালনা করলেও কলকাতায় বসে অপকর্মটি সংগঠিত করেছিল আফতাবের বিশ্বস্ত সাঙাৎ, কলকাতার বেনিয়াপুকুর এলাকার ছেলে আসিফ রেজা খান। আসিফ ছিল এখন নিষিদ্ধ ইসলামি ছাত্র সংগঠন সিমির সক্রিয় সদস্য আর হিজবুল মুজাহিদিনের সমর্থক। পুলিশি জেরায় আসিফ স্বীকার করেছিল ১৯৯২ সালে সে হিজবুল কমান্ডার সালাহউদ্দিনের সঙ্গে দেখা করেছিল, সে তাকে কলকাতা স্টক এক্সচেঞ্জ উড়িয়ে দেওয়ার পরামর্শ দেয়। আসিফ কাজ করত আফতাবের ফ্রন্ট-ম্যান হিসেবে, খুঁজে খুঁজে ছেলেপিলে জোগাড় করে দলে ভেড়ানোর দায়িত্ব ছিল তার। আসিফ ছেলে-ধরার জাল বিছিয়েছিল অসংখ্য শহরে- দিল্লি, কলকাতা, ভূপাল, আগ্রা, গুরগাঁও, আলওয়ার, মালেগাঁও, মুম্বই, আম্বালা, আজমের, জয়পুর, লুধিয়ানা, নাসিক, আহমেদাবাদ, রাজকোট এবং বারাণসী। তাদের নিরাপদ আস্তানার ব্যবস্থাও করা হতো পুলিশের নজর এড়াতে। সব্বাইকে একটাই টোপ দেওয়া হতো, দুবাইয়ে নিয়ে গিয়ে সেখানে পাকাপোক্ত কিছুর ব্যবস্থা করার। রাজকোটে পুলিশের হেফাজত থেকে পালানোর চেষ্টা করতে গিয়ে বেঘোরে প্রাণ হারায় আসিফ। তবে তার আগে পুলিশের কাছে দেওয়া জবানবন্দিতে জেহাদি-অপরাধী যোগসাজশ নিয়ে অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছিল আসিফ। যার অনেকটাই অনুসন্ধানের পরে সত্য বলে প্রমাণিত হয়।

অপহরণ করে মোটা টাকার মুক্তিপণ আদায় করাই ছিল আফতাব বাহিনীর কাজ। কলকাতায় খাদিম কর্তার অপহরণের আগে তারা মুম্বইয়ের এক ব্যবসায়ীকে অপহরণ করে কাঠমান্ডুতে নিয়ে গিয়ে টানা ৫৫ দিন আটকে রেখেছিল। শেষ পর্যন্ত ২২ কোটি টাকা মুক্তিপণ দিয়ে তাঁকে ছাড়ানো হয়। পাটনা, বেনারস, কানপুর, এলাহাবাদ, জামশেদপুর, রাজকোটে বিত্তশালীদের চিহ্নিত করে অপহরণ করাটা যেন আফতাব বাহিনীর খেলা হয়ে দাঁড়িয়েছিল। সবাই পুলিশে খবর দিত না, আত্মীয়-স্বজন নিজেরাই দরাদরি করে গোপনে মুক্তিপণ দিত। পার্থ ভট্টাচার্য বলেছিলেন, ২০০১ সালের একটি বছরে আফতাব বাহিনী শুধু মুক্তিপণ থেকেই ৫৫ কোটি টাকা তুলেছিল।

আন্তর্জাতিক মাফিয়া আর অপহরণ-চক্রের মানচিত্রে কলকাতা নামক বদ্ধ জলাশয়টি ঢুকে পড়বে এটাই ছিল সবচেয়ে আশ্চর্যের ব্যাপার। তার আগে কলকাতায় যে অপহরণ একেবারেই হতো না তা নয়, তবে স্থানীয় গুন্ডা-মস্তানেরাই সে কাজ করত। খাদিম কর্তা অপহরণ কাণ্ড কলকাতাকে তুলে আনল আন্তর্জাতিক মিডিয়ার শিরোনামে। (চলবে)

Leave a comment

Your email address will not be published.