logo

বুদ্ধং শরণং (পর্ব-১০)

  • August 17th, 2022
Memoir

বুদ্ধং শরণং (পর্ব-১০)

সুমন চট্টোপাধ্যায়

আমি যা উচিত বলে মনে করি সেটাই বলি, যেটা আমার কর্তব্য বলে মনে করি সেটাই করার চেষ্টা করি। আমাকে যদি এক লাইনে বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের চরিত্রায়ন করতে হয়, তাহলে এই কথাই বলব। মুখে-মনে এক হওয়াটা মিথ্যে আর কপটতা সর্বস্ব রাজনীতিতে গুণ না দোষ বলে বিবেচিত হবে, সেটা সঙ্গত তর্কের বিষয়। কেননা এই চরিত্রগুণের সঙ্গে রাজনৈতিক সাফল্যের কোনও সম্পর্কই নেই। বরং আসমুদ্রহিমাচল ভারতবর্ষে উল্টোটাই সত্য বলে মনে হয়। যে রাজনীতিবিদ যত বড় ঢপবাজ কিংবা নাটুকেপনায় সিদ্ধহস্ত, তিনি যেন তত বেশি করে সফল। বুদ্ধবাবুর অনেক গুণগ্রাহীকে বলতে শুনেছি, ‘হিজ ইজ দ্য রাইট ম্যান ইন দ্য রং পার্টি।’ আরও এক ধাপ এগিয়ে আমার মাঝেমাঝে মনে হয়, বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য হয়তো এই কদর্য ক্ষমতার রাজনীতিতে নেহাতই বেমানান।

কে কী বলবে, দল কী ভাবে নেবে, আমজনতার উপর কী ধরনের প্রভাব পড়বে এই সব পরিচিত অঙ্কের তোয়াক্কা না করে বুদ্ধবাবু কত রকম প্রসঙ্গে যে কত রকম সত্য কথা বলে ফেলেছেন তার হিসেব রাখা মুশকিল। মাদ্রাসা নিয়ে প্রশ্ন তুললে সংখ্যালঘু সমাজে বিরূপ প্রতিক্রিয়া হবে এবং তার ফলে ভোটের অঙ্ক কষা দলীয় কমরেডরা অস্বস্তির মধ্যে পড়বেন, সত্যি কথাটা বলার সময় বুদ্ধবাবু এ সব প্রসঙ্গ ধর্তব্যের মধ্যেই আনেননি। দুঁদে রাজনীতিক হলে অবশ্যই আনতেন। দেশ বিরোধিতার কথা বললে একটি গোটা সম্প্রদায় কেন ক্ষুণ্ণ হবে, হলেও তার কাছে কেন মাথা নত করতে হবে, বুদ্ধবাবুর স্বচ্ছ-চেতনায় এই জাতীয় ক্রূর প্রশ্নের কোনও জায়গা ছিলনা। মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে যে সব তথ্য তাঁর হাতে এসেছে তিনি তার ভিত্তিতেই যা বলার বলবেন এবং নতুন আইন প্রণয়নের চেষ্টা করবেন। টেক ইট অর লিভ ইট।

কিংবা ধরুন ধর্মঘট আর বনধ সম্পর্কে তাঁর প্রকাশ্য অভিমত। তাজ বেঙ্গল হোটেলের ব্যাঙ্কোয়েট হলে যে শিল্পপতি সমাবেশে বুদ্ধবাবু বিতর্কিত মন্তব্যটি করেছিলেন আমি সেখানে উপস্থিত ছিলাম। প্রশ্নোত্তর পর্বে একজন ব্যবসায়ী উঠে দাঁড়িয়ে মুখ্যমন্ত্রীকে প্রশ্ন করেন, শিল্পায়ন হবে আবার বনধও হবে, এটা কি সম্ভব? চোখের পলকে বুদ্ধবাবু উত্তর দিলেন, “হোয়াট ইউ আর সেয়িং ইজ রাইট। আনফরচুনেটলি আই রিপ্রেজেন্ট এ পার্টি দ্যাট বিলিভস ইন স্ট্রাইকস অ্যান্ড ক্লোজার।” সভাকক্ষে পিন ড্রপ সায়লেন্স, এ ওর মুখ চাওয়া চাওয়ি করছে মুখ্যমন্ত্রীর কথা হজম করতে না পেরে। ভূতের মুখে রামনাম শুনলে যে অবস্থা হয় আরকী!

কিংবা শিল্পায়ন। বুদ্ধবাবুর বিখ্যাত স্লোগান ছিল, ‘কৃষি আমাদের ভিত্তি, শিল্প ভবিষ্যৎ।’ এ পর্যন্ত ঠিকই ছিল। যেই সালেমদের জন্য দক্ষিণ চব্বিশ পরগনায় সাড়ে পাঁচ হাজার একর জমি অধিগ্রহণের বিষয়টি সামনে এল, মুখ্যমন্ত্রীকে প্রকাশ্যে বলতে শোনা গেল, ‘‘শিল্প তো আর আকাশে করা সম্ভব নয়। কারখানা করতে গেলে জমি লাগবেই। কৃষি জমিই লাগবে। এর বাইরে বিকল্প কোনও রাস্তা নেই। সরকার হিসেবে আমাদের কর্তব্য হবে যে সব কৃষক জমি দিলেন তাঁরা যাতে উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ পান সেটা নিশ্চিত করা।”

প্রতিটি ক্ষেত্রেই তীব্র বিরোধিতার মুখে পশ্চাদপসরণ করতে হয়েছিল বুদ্ধবাবুকে। মাদ্রাসা কাণ্ডে ল্যাজে-গোবরে হয়ে শেষ পর্যন্ত মিডিয়ার ঘাড়ে দোষ চাপিয়ে তিনি কোনও মতে আত্মরক্ষা করেছিলেন। বনধ বিতর্কে তো সাংবাদিক বৈঠক ডেকে রাজ্য সম্পাদকের পাশে বসে নিজের কথা প্রত্যাহার করতে হয়েছিল। আর জমি অধিগ্রহণ করতে গিয়ে পরিণতি কী হয়েছিল তার পুনরাবৃত্তি নিষ্প্রয়োজন। তবু বলব, নিজের বিশ্বাস এবং প্রত্যয়ে অবিচল থাকতে পারার জন্যই বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য ব্যতিক্রমী রাজনীতিক, যাঁর সমতুল্য কেউ আমার চোখে পড়েনি গত চল্লিশ বছরে। সৎ এবং স্ফটিকের মতো স্বচ্ছ।

কতটা তা বোঝাতে আমার নিজের অভিজ্ঞতার কথাই বলি। বুদ্ধদেববাবু নিজের থেকে টেলিফোন করে আমায় মহাকরণে ডেকে নেওয়ার পরে সেই যে দরজা খুলল, আর বন্ধ হয়নি। কথায় কথায় অনেকবার তিনি আমাকে বলেছেন, ‘‘আপনি আনন্দবাজারে আমাকে যখন গালাগাল করতেন, রাগে আমার সারা শরীর রি রি করত। মাঝে মাঝে মনে হত কোনও না কোনওভাবে আপনাকে একটু সবক শেখানো প্রয়োজন। এখন বুঝতে পারি ওই সমালোচনাগুলো আমাদের প্রাপ্য ছিল। আমাদের ভুলগুলো আপনারা দেখিয়ে দিতেন আমাদের মঙ্গলের জন্য আর রাজ্যের স্বার্থে।’ প্রথম দিন মুখ্যমন্ত্রীর মুখে এমন অকপট, অনাবিল, আত্মসমালোচনা শুনে আমি স্তম্ভিত হয়ে হয়ে গিয়েছিলাম, প্রথম ঝটকায় মনে হচ্ছিল আমি বোধহয় দিবাস্বপ্ন দেখছি। মনে হচ্ছিল, আরে ভদ্রলোক এ সব কী কথা বলছেন? এটা কি তাঁর মনের কথা না সুচতুর পাবলিক রিলেশনস এক্সারসাইজ? অচিরেই বুঝতে পারলাম আমার সন্দেহ অমূলক, তিনি যা বলেছেন কাতে কোনও ভনিতা নেই। সাংবাদিকের পেশাদারিত্বের দায় কিছুটা ভুলে গিয়েই সেই আমার ‘বৌদ্ধ’ হওয়া শুরু। সত্যি কথা বলতে কী ভদ্রলোকের প্রতি আমার ভক্তি-শ্রদ্ধা এক লহমায় অনেক গুণ বেড়ে গেল।

ইচ্ছে করলে সচেতনভাবে নিজেকে যে সম্পূর্ণ বদলে ফেলা যায়, বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য আমার কর্মজীবনে দেখা একমাত্র দৃষ্টান্ত। জ্যোতি বসুর মন্ত্রিসভায় সবচেয়ে দাম্ভিক আর উন্নাসিক সদস্য হিসেবে দুর্নাম ছিল তাঁর। নানা প্রসঙ্গে ইতি-উতি তাঁর মন্তব্যে সেই দম্ভ বেআব্রু হয়ে পড়ত। সাংবাদিকদের তিনি মনুষ্যপদবাচ্য বলে মনে করতেন না, ব্যবসায়ী-শিল্পপতিদের সান্নিধ্য সচেতনভাবে এড়িয়ে চলতেন, বিরোধীদের অকারণ খোঁচা না দিয়ে কথাই বলতেন না। মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পরে সেই একই মানুষের যেন পুনর্জন্ম ঘটে গেল। সাংবাদিকদের সঙ্গে নিজের সম্পর্কটা তিনি স্বাভাবিক করে ফেললেন, নন্দনে যাওয়াটা অনিয়মিত হয়ে গেল পুঁজির সন্ধানে ব্যবসায়ীদের সঙ্গে সময় কাটাতে গিয়ে। সর্বোপরি তাঁর কথায় বার্তায় ফুটে উঠল সময়ের বদলের সঙ্গে পা মিলিয়ে সরকারি নীতি ও কর্মপদ্ধতি বদলে ফেলার অভিপ্রায়। হঠাৎ আমরা বিশ্বাস করতে শুরু করলাম, বাংলার মলিন মুখচ্ছবিটা কেউ যদি বদলাতে সম্ভব হন তাহলে এই নির্বাণপ্রাপ্ত বুদ্ধদেবই তা পারবেন। (চলবে)

Leave a comment

Your email address will not be published.