logo

বুদ্ধং শরণং (পর্ব-১)

  • August 16th, 2022
Memoir

বুদ্ধং শরণং (পর্ব-১)

সুমন চট্টোপাধ্যায়

২০০১-এর বিধানসভা নির্বাচনের ঠিক আগে জ্যোতি বসুর শূন্যস্থানে বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যকে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী করাটা ছিল সিপিএমের মাস্টার-স্ট্রোক। এই একটি সিদ্ধান্ত বিরোধীদের পাল থেকে অনেকখানি হাওয়া কেড়ে নিতে পেরেছিল ময়দানে লড়াই শুরু হওয়ার আগেই।

বামফ্রন্ট সরকারের বয়স তখন ২৪ ছুঁই ছুঁই, সামনে ষষ্ঠবারের জন্য ক্ষমতা দখলে রাখার লড়াই। একটানা এতদিন ধরে ক্ষমতায় থাকার পরে সেবারই প্রথম হাওয়া উঠেছিল পরিবর্তনের। বাংলার মিডিয়ায় ঢাক-ঢোল পিটিয়ে প্রচার শুরু হয়েছিল এ বার সরকার বদল অবশ্যম্ভাবী। বিরোধী আক্রমণের মূল লক্ষ্যটি ছিলেন জ্যোতি বসু। তখন তাঁর বয়স ৮৬। শারীরিক কারণেই মুখ্যমন্ত্রিত্বের গুরুভার বহন করতে অপারগ। মাঝে মাঝেই তিনি অবসর নেওয়ার কথা বললেও কেউ তাতে গুরুত্ব দিতেন না। বামফ্রন্টে জ্যোতিবাবুর অবস্থান এতটাই নির্বিকল্প আর অপরিহার্য ছিল যে তাঁকে বাদ দিয়ে বামেরা ভোটে যেতে পারে সেটাই অকল্পনীয় ছিল। কখনও কখনও পরিস্থিতি এমন হয় যখন বাস্তবের অনিবার্যতাও আমরা অনেক সময় স্বীকার করতে চাই না।

অথচ ভোটের ঠিক ছয় মাস আগে রাজ্য সিপিএম নেতৃত্ব আপাত-অসম্ভব ঘটনাটিকেই সম্ভব করে ছাড়লেন। মিডিয়ার কোনও কোনও মহলে ছড়ানো হল সিপিএমের অন্দরে নীরব অভ্যুত্থানের গপ্পো। বলা হল অনিল-বুদ্ধ-বিমান একজোট হয়ে নাকি এই কাণ্ডটি করেছেন। হাস্যকর এই তত্ত্ব নিয়ে সঙ্গত কারণেই কেউ তখন মাথাব্যথা করেনি। তবে এই অতর্কিত মহাবদল ঘটে যাওয়ার অব্যবহিত পরে আলিমুদ্দিনে নিজের ঘরে বসে রাজ্য সম্পাদক অনিল বিশ্বাস আমাকে যা বলেছিলেন, এত বছর পরে এখনও তা হুবহু মনে আছে। ‘তোমরা পরিবর্তন, পরিবর্তন করে লম্ফঝম্ফ করছিলে। এই দ্যাখো, ভোটের আগেই আমরা সেই পরিবর্তন করে দিলাম। বদল যখন হয়েই গেল তখন আবার ভোটে বদল কী প্রয়োজন?’ সাধে কি আমরা অনিল’দার নাম ‘চাণক্য’ দিয়েছিলাম?

বামফ্রন্টের নেতৃত্বে কাঙ্ক্ষিত বদল ঘটানোর পরেও কিন্তু রাজ্য সিপিএম নেতৃত্বের নার্ভাসনেস পুরোটা কাটেনি। জ্যোতি বসুর বিকল্প হিসেবে বুদ্ধদেব জনতা-জনার্দনের কাছে কতটা গ্রহণযোগ্য হবেন তা নিয়ে একটা সংশয় তো ছিলই, গোটা বিষয়টি তখনও পর্যন্ত ছিল অপরীক্ষিত। তবে সিপিএম নেতাদের শীরঃপীড়ার মূল কারণটি ছিল কংগ্রেসের সঙ্গে তৃণমূল কংগ্রেসের জোট। কংগ্রেস থেকে বেরিয়ে নতুন দল গড়ে মমতা প্রথমে বাজপেয়ীর নেতৃত্বাধীন এনডিএ-তে যোগ দিয়েছিলেন। তেহলকা কাণ্ডের পরে হঠাৎ নাটকীয় ভাবে তিনি কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভা থেকে ইস্তফা দিলেন। বেরিয়ে আসলেন জোট থেকেও। পরিস্থিতির বাধ্যবাধকতা মেনে ২০০১-এর বিধানসভা ভোটে তিনি কংগ্রেসের সঙ্গে জোট করার সিদ্ধান্ত নিলেন ঘোর অনিচ্ছা সত্ত্বেও। মাত্রই তিন বছর আগে কংগ্রেস ভেঙেছিলেন তিনি, এত অল্প দিনের ব্যবধানে সেই দলের সঙ্গেই নির্বাচনী জোটের মধ্যে এক ধরনের অস্থিরতা ও অস্বাভিবকতা তো ছিলই। বলতে গেলে কংগ্রেস সভানেত্রী সনিয়া গান্ধী এক রকম জোর করে এই জোট চাপিয়ে দিয়েছিলেন রাজ্য কংগ্রেস নেতাদের ওপর। দল ছাড়ার আগে মমতার সঙ্গে কংগ্রেস হাইকমান্ডের লড়াইয়ে সনিয়া সে ভাবে হস্তক্ষেপ করতে পারেননি, কেননা তিনি তখনও সক্রিয় রাজনীতি থেকে নিজেকে সরিয়ে রেখেছিলেন। কিন্তু কংগ্রেসের সভানেত্রী হওয়ার পরে মমতার সঙ্গে যখন নতুন করে সেতু বন্ধনের একটা সুযোগ উপস্থিত হল, তিনি কোনও মূল্যে তা হাতছাড়া করতে চাননি।

আমার চার দশকের সাংবাদিক জীবনে আমি হরেকরকমবা জোট গঠন এবং ভেঙে যাওয়া প্রত্যক্ষ করেছি। কিন্তু ২০০১-এর পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা ভোটে দুই কংগ্রেসের জোটের মতো কিম্ভুতকিমাকার জোট আর কখনও দেখেছি বলে মনে পড়ে না। জোটবদ্ধ হয়ে লড়তে হবে রাজ্য কংগ্রেস নেতাদের অথচ আসন বণ্টনের আলোচনায় তাঁদের প্রবেশ করতেই দেওয়া হল না। সনিয়ার প্রতিনিধি হয়ে মমতার সঙ্গে সেই আলোচনা করলেন কমলনাথ। প্রণব মুখোপাধ্যায়, বরকত গনিখান চৌধুরী, প্রিয়রঞ্জন দাসমুন্সি, সোমেন মিত্রর মতো তাবড় নেতারা সাইড লাইনের বাইরেই বসে থাকলেন। তাঁদের সম্পূর্ণ অন্ধকারে রেখে মমতার শর্তে জোট করল কংগ্রেস হাইকমান্ড।

ফলে কতকটা অনিবার্য ভাবেই কাগজের জোট জমিতে বাস্তবায়িত হল না। ডিভোর্সে বদ্ধপরিকর দম্পতি যেমন অনেক সময় আদালতের নির্দেশে একই ছাদের তলায় থাকতে বাধ্য হন, একেবারে সেই অবস্থা ছিল দুই কংগ্রেসের নেতাদের। যৌথ কর্মসূচি নেই, যৌথ প্রচার নেই, গোঁজ প্রার্থীতে কন্টকিত একের পর এক আসন, জোটের এক শরিকের প্রধান লক্ষ্য অন্য শরিককে হারানো। বেশ মনে আছে, সনিয়া আর মমতার একটি যৌথ জনসভা হয়েছিল খড়্গপুরে। দুই নেত্রী মঞ্চের দুই

কোনে দাঁড়িয়ে রইলেন সারাক্ষণ। দু’জনের ভাব-ভঙ্গি, শরীরের ভাষায় আড়ষ্টতার ছাপ স্পষ্ট।

এমন অর্থহীন জোট নিয়েও আমি কিন্তু অনিল বিশ্বাসের কপালে চিন্তার ভাঁজ দেখেছিলাম। ভোটের আগে ঘনঘন আমার তাঁর কাছে তলব পড়ত। তিনি খুঁটিয়ে জানতে চাইতেন কোথায় কী হচ্ছে। তাঁর দুশ্চিন্তা যে সম্পূর্ণ অমূলক ছিল না, ভোটের ফলাফলে তা স্পষ্ট হয়ে উঠল। বামফ্রন্ট সসম্মানে জিতলেও বিধানসভায় সিপিএমের যে একক সংখ্যা গরিষ্ঠতা ছিল, ৭৭-এর পরে এই প্রথম তা রইল না। কংগ্রেস আর তৃণমূল কংগ্রেস দুয়ে মিলে পেল ৮৬টি আসন। কিন্তু কেন্দ্রওয়াড়ি পর্যালোচনায় বোঝা গেল গোঁজ প্রার্থীদের কারণে বেশ অনেকগুলি আসন জোটের হাতছাড়া হয়ে গিয়েছে। বোঝা গেল, মমতা-কংগ্রেসের জোট অর্থবহ হলে দুই প্রতিপক্ষের লড়াই হতো আরও কাছাকাছি।

সিপিএমের কিয়দাংশে খণ্ডিত সাফল্যের জন্য কেউ বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যকে দায়ী করেনি, সাফল্যের কৃতিত্বও আলাদা করে কেউ দেয়নি তাঁকে। তবে সিপিএমের একক গরিষ্ঠতা না থাকলে বামফ্রন্টের অন্দরে কী অসুবিধে হয়, অচিরেই বুদ্ধবাবু তা টের পেতে শুরু করলেন। বিভিন্ন ইস্যুতে শরিক দলের নেতাদের গলার আওয়াজ হঠাৎ বেড়ে গেল, চড়া সুরে শুরু হল তাঁদের বিরোধিতা। কথায় কথায় একবার বুদ্ধবাবুর কাছে জানতে চেয়েছিলাম, শরিকেরা এমন বিরোধীদের মতো আচরণ করছে কেন?

বুদ্ধবাবু— ‘করত না, যদি আমরা আরও পাঁচ-ছয়টি আসন বেশি পেতাম।’ (চলবে)

Leave a comment

Your email address will not be published.