logo

হে মোর দুর্ভাগা দেশ

  • August 13th, 2022
Suman Nama

হে মোর দুর্ভাগা দেশ

সুমন চট্টোপাধ্যায়

আমি জেদি, বাঙালের বাচ্চা, জমি ছেড়ে পালানোর বান্দা তো নই-ই। আমার দিল্লি জীবনের সূচনায় ‘প্রিয়র লোক’ মনে করে যাঁরা আমাকে দূর দূর ছেই ছেই করলেন, মনে মনে প্রতিজ্ঞা করলাম, তাঁদের সব দরজা আমি খোলাবই। ধাক্কা খেয়েছি, অপমানিত লেগেছে, তবু লেগে থেকেছি। বরকত সাহেব আর সন্তোষ মোহনের ভুN ভাঙাতে আমার সময় লেগেছিল, কেন না দু’জনেই ছিলেন কান পাতলা, কিন্তু শেষমেশ আমি সফল হয়েছিলাম।

সাংবাদিকতায় যোগ দিয়ে যে সব বাচ্চা ছেলেমেয়েরা আমার কাছে আসে তাদের সবাইকে বলি, যদি মনে করো তোমার চলার পথ কুসুমাস্তীর্ণ তাহলে বড্ড ভুল করবে। এ এমন পেশা যেখানে ধাক্কা খেতে খেতে এগোতে হয়, পড়ে গেলে আবার উঠে দাঁড়াতে হয়, কোনও অপমান, অবজ্ঞা গায়ে মাখলে চলে না। লক্ষ্য যদি স্থির থাকে আর থাকে অবিচল প্রত্যয়, আজ না হয় কাল সুফল মিলতে বাধ্য। লোকে কেবল সাফল্যটাকে দেখে, তার পিছনে যে কঠোর পরিশ্রম, অধ্যবসায় আর অশ্রুপাতের কাহিনি থাকে তা জানতে চায় ক’জনা?

১২ নম্বর আকবর রোডের প্রশস্ত বাংলোর বসার ঘরে নির্জন দুপুরে নিঃসঙ্গ বরকত সাহেব যখন জলসাঘরের জমিদারের মতো বসে থাকতেন আমি নিয়মিত তাঁকে সঙ্গ দিতাম। একদিন না গেলেই অপ্রসন্ন হতেন। ঘরে ঢুকতেই বলতেন, সে কি কাল এলেন না তো! বরকত সাহেব এমনিতে আড্ডাবাজ মানুষ ছিলেন না, থেমে থেমে অনেক সময় নিয়ে কথা বলতেন। আমার কাজ ছিল অতি মোলায়েম ভাবে অতীতের নানা কাহিনি নিয়ে প্রশ্ন করা, বিশেষ করে ইন্দিরা গান্ধী ও সঞ্জয়ের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক নিয়ে। উত্তর দিতে দিতে বরকত সাহেব কখনও হঠাৎ খুব উত্তেজিত হয়ে পড়তেন, পরক্ষণেই একগাল হাসি। দিন গেলে তাঁর সঙ্গে আমার ব্যক্তিগত সম্পর্কের রসায়ন তৈরি হয়েছিল। যদিও আমি তাঁর অনুগত সাংবাদিকদের বলয়ে মাথা ঢোকানোর কোনও চেষ্টাই করিনি। তাঁরা প্রিটোরিয়ান গার্ডদের মতো বরকত সাহেবকে ঘিরে রাখত, মাছি গলারও কোনও উপায় ছিল না। আমার কপাল ভালো কেউ আমাকে বরকত-প্রণব অথবা সন্তোষমোহনের লোক বলে বাজারে চাউড় করেননি।

পিছন ফিরে এখন মনে হয় প্রণব মুখোপাধ্যায় বোধহয় বেশ ভারাক্রান্ত মনেই আমার সম্পর্কে নিজের ওই মূল্যায়ন শুভাপ্রসন্নকে শুনিয়েছিলেন। কেন না ব্যক্তিগত স্তরে এত ঘনিষ্ঠতা সত্ত্বেও আমি নিজের লেখায় প্রণববাবুর কর্কশ সমালোচনা করেছি বারে বারে। কাগজের লেখা পড়ে খুশি-অখুশি হওয়ার মানুষ তিনি ছিলেন না। ঘোর অপছন্দ হলেও সাক্ষাতের সময় তিনি তা বিন্দুমাত্র বুঝতে দিতেন না। প্রিয়-বরকত- সন্তোষ-মমতা এঁদের সকলেরই প্রতিক্রিয়া ছিল কম-বেশি আবেগতাড়িত। এঁদের মধ্যে প্রণববাবু ছিলেন উজ্জ্বল ব্যতিক্রম। বুকে যতই ঘা লাগুক, মুখটা থাকত নির্বিকার। অনেক পরে রাষ্ট্রপতি ভবনে বসে প্রণববাবু আমায় বলেছিলেন, বর্ধমানে তাঁর কোনও এক ভক্ত আছেন, যিনি রবিবার আমার লেখা বেরোনোর সঙ্গে সঙ্গে তাঁকে ফোন করে পুরোটা শুনিয়ে দিতেন। ‘আবার তুই যখন আমায় গাল দিতি, সে রাগে অগ্নিশর্মা হয়ে আমার কাছে তোর বাপ-বাপান্ত করত। বলত, এই পাজি লোকটাকে শায়েস্তা করার বন্দোবস্ত করুন।’
ছুঁচো মেরে হাত গন্ধ করার মানুষ ছিলেন না প্রণব মুখোপাধ্যায়। খবরের কাগজের সঙ্গে রাজনীতিকদের তাল ঠোকাঠুকিকে তিনি অবাধ গণতন্ত্রের আবশ্যিক শর্ত বলেই মনে করতেন। আমার সঙ্গে আড্ডায় মাঝে মাঝেই তিনি একটি বিষয়ে নেহরুর সঙ্গে তাঁর মিলের কথা বলতেন- কার্টুন প্রেম। কোনও কাগজ অথবা ম্যাগাজিন হাতে এলে তিনি সর্বাগ্রে দেখতেন কোনও কার্টুন আছে কি না। তাঁকে নিয়ে যত কার্টুন প্রকাশিত হয়েছিল তার মধ্যে থেকে ঝাড়াই বাছাই করে একগুচ্ছ কার্টুনের একটি প্রদর্শনী হয়েছিল রাষ্ট্রপতি ভবনে। কলকাতার ফ্ল্যাটের বাইরের ঘরে যে জলচৌকিটির ওপর বসে তিনি অতিথিদের সঙ্গে গল্প-গুজব করতেন তার ঠিক পিছনের দেওয়ালে ঝোলানো ছিল কুট্টির আঁকা একটি বিখ্যাত কার্টুন।

আর নেহরুর জমানায়? এ দেশে রাজনৈতিক কার্টুনের জনক ছিলেন কেশবশঙ্কর পিল্লাই, ছাত্র আর কে লক্ষ্মণের মতো তাঁরও ছিল ভারত-জোড়া খ্যাতি। দেশের স্বাধীনতা থেকে জরুরি অবস্থা এক দীর্ঘ সময়ের ইতিহাসের তিনি জীবন্ত সাক্ষী। শঙ্করের কর্মজীবনের একটি বড় সময় কেটেছিল ‘হিন্দুস্থান টাইমসে’। ভাইসরয় থেকে মহম্মদ আলি জিন্না, শঙ্কর কাউকেই রেয়াৎ করতেন না। কারও উপদেশেও কর্ণপাত করতেন না। জিন্নাকে নিয়ে শঙ্করের আঁকা কার্টুন মহাত্মা গান্ধীর ঘোরতর অপছন্দ ছিল। ১৯৩৯ সালে শঙ্করকে চিঠি লিখে গান্ধী বললেন, ‘Your cartoons are good as works of art. But if they do not speak accurately and can not joke without offending, you will not rise high in your profession. Your study of events should show that you have an accurate knowledge of them. Above all you should never be vulgar. Your ridicule should not bite.’

শঙ্কর কিছুই করলেন না, গান্ধীর উপদেশ এক কান দিয়ে শুনে আর এক কান দিয়ে বের করে দিলেন। গান্ধী-পুত্র দেবদাস যখন হিন্দুস্থান টাইমসের সম্পাদক তাঁর সঙ্গে ঘোর মত-বিরোধ হল শঙ্করের। তিনি রাজাগোপালাচারির এমন সব কার্টুন আঁকতে শুরু করলেন যা দেবদাস গান্ধী মেনে নিতে পারেননি। রাজাজি কেবল প্রথম সারির কংগ্রেস নেতা ছিলেন না, সম্পর্কে দেবদাস গান্ধী ছিলেন তাঁর জামাই। শঙ্করকে বারণ করা হল, তিনি শুনলেন না। একদিন তিনি হিন্দুস্থান টাইমসের চাকরি থেকেই ইস্তফা দিয়ে বসলেন। তার কিছুকাল পরে শঙ্করের সঙ্গে দেখা হলে গান্ধীজি তাঁকে প্রশ্ন করেছিলেন, ‘হিন্দুস্থান টাইমস তোমাকে বিখ্যাত করল না তুমি বিখ্যাত করলে হিন্দুস্থান টাইমসকে?’

তুলনায় প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরুর সঙ্গে শঙ্করের যথেষ্ট ঘনিষ্ঠতা ছিল। নয় নয় করে ভারতের প্রধানমন্ত্রীর হাজার চারেক কার্টুন এঁকেছিলেন তিনি। বন্ধু বলে শঙ্কর প্রধানমন্ত্রীকে রেয়াৎ করতেন এমন নয়। বেশ কয়েকটি কার্টুনে তিনি একেবারেই নির্দয়, ফালাফালা করে দিয়েছেন নেহরুকে। তাতে দু’জনের সম্পর্কে কোনও ফাটল ধরেনি বরং নেহরুই বারবার বলতেন, ‘ডোন্ট স্পেয়ার মি শঙ্কর।’

এ ব্যাপারে নেহরুর মতামতও ছিল সোজা-সাপ্টা। একেবারে গান্ধীর বিপরীত। তিনি মনে করতেন, পাবলিক লাইফে যাঁরা আছেন, তাঁদের ভুলত্রুটি, দুর্বলতা ধরিয়ে দেওয়াই তো কার্টুনিস্টের কাজ। ‘It is good to have the veil of our conceit lifted occasionally.’ এর অর্থ নেহরু আন্তরিক ভাবেই বিশ্বাস করতেন তাঁর দুর্বলতাগুলিও তাঁকে মাঝে মাঝে মনে করিয়ে দেওয়া বিশেষ প্রয়োজন। মনে রাখা প্রয়োজন, কেউই অমর নন। ‘Perfection is not for any man however powerful and highly placed he may be.’

বিশ্বাস হয় না, একদা ভারতবর্ষের চেহারাটা এই রকম ছিল যখন গান্ধীজির মতো ক্ষণজন্মা নেতার অযাচিত উপদেশ অগ্রাহ্য করার দুঃসাহস ছিল এক সামান্য কার্টুনিস্টের কিংবা যিনি ডাল-ভাতের তাড়নায় সম্পাদকের নির্দেশ কলার তুলে অমান্য করে চাকরিটাই ছেড়ে দিয়ে নিজের ম্যাগাজিন প্রকাশের দুঃসাহস দেখাতে পেরেছিলেন। শিল্পীর এমন অনমনীয় মনোভাবের জন্য তাঁর ব্যক্তিগত ক্ষতি হয়েছে, রাষ্ট্রশক্তি তাঁকে সবক শেখাতে ময়দানে নেমে পড়েনি। ভারতের গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের সেই স্বর্ণযুগে মত প্রকাশের স্বাধীনতাকে নিয়ন্ত্রিত করার কথাটিই কেউ ভাবেননি। আজ এমন একজন শঙ্কর থাকলে তাঁর গায়ে কী কী লেবেল সেঁটে দেওয়া হতো তা সহজেই অনুমেয়। কোন গুমঘরে তাঁর জায়গা হতো কে জানে!

Leave a comment

Your email address will not be published.