logo

হাফসোল-১২

  • August 16th, 2022
Man-Woman

হাফসোল-১২

হারামানিক

অভিযান ভট্টাচার্য্য

জীবন বিজ্ঞানে যে বছর হরমোন পড়ানো শুরু হল, ঠিক সেই বছর কী এক অদ্ভুত সমাপতনে বসন্তকালটাকে অসহ্য রকমের মনোহর মনে হতে লাগল৷ হঠাৎ আবিষ্কার করলাম, বুকের গভীরে কোথায় যেন একটা বিরাট শূন্য গহ্বর অ্যাদ্দিন ধরে বেমালুম বয়ে বেরিয়েছি৷ সে শূন্যতা ক্রমেই অসহনীয় হয়ে উঠল৷ ফেলুদা থেকে ফুটবল – সব ওষুধই ফেল করল৷  আচমকা একদিন কোন এক দৈবঘটিত জৈব ক্রিয়ায় মনে হল, বুকের ভেতরের ওই ব্যথা ভরার একটাই ওষুধ - মর্মসহচরী! ব্যস! যাদের এতদিন শুধুমাত্র সহপাঠিনী বলে জানতাম, তারাই সব হঠাৎ ‘নারী’ হয়ে উঠল৷ কিন্তু, শূন্যস্থানের মাপে কেউই খাপ খায় না৷

এমনিতে আমার গোবেচারা ভালো ছেলে হিসেবে সুনাম ছিল৷ পড়ি বয়েজ স্কুলে৷ নিরঙ্কুশ পুরুষতন্ত্র৷ নারী সান্নিধ্যের সুযোগ বলতে একমাত্র হরিমাধব স্যারের বাংলার কোচিং৷ অন্যত্র ছেলে আর মেয়েদের আলাদা ব্যাচ৷ সেই কোচিং-এই হঠাৎ একদিন একঝাঁক মন-কেমন-করা বাতাস সঙ্গী করে এসে বসল সুরঞ্জনা৷ মনের গভীরে কে যেন বলল, ‘ইউরেকা!’ হৃদয়ের শূন্যস্থান পূরণের আয়োজন বুঝি মদনদেবের লীলায় সমাগত, শুধু মনের কথাটুকু সুরঞ্জনার মরমে পশিয়ে দিতে হবে।

কিন্তু, কী ভাবে? একে তো আমি মুখচোরা৷ তায় পরিণামের ভয়৷ সুরঞ্জনা ‘না’ বলে যদি! জানাজানি হলে বন্ধু মহলে হাসাহাসি হবে৷ সে না হয় সয়ে নেব৷ কিন্তু, বাড়িতে খবর হলে? ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট বাবার ধমকে থানার বড়বাবুকে পর্যন্ত কাঁপতে দেখেছি; আমি তো নস্যি! কিন্তু মনের মধ্যে তো হরমোনের হারমনি শুরু হয়ে গেছে! সে কি আর এসব মানে?

সারা সপ্তাহ অপেক্ষায় থাকতাম বাংলার কোচিং-এর জন্য৷ সুরঞ্জনার আসার সময় মিলিয়ে কোচিং-এ ঢোকার চেষ্টা করতাম৷ মাঝে মাঝে চোখাচোখিও হত৷ ও ভুরুর উপর ঝাঁপিয়ে আসা চুলগুলো দু’আঙুলের ফাঁকে ধরে সযত্নে কানের পাশে রাখতে রাখতে চোখ সরিয়ে নিত৷ কোন কোন দিন মনে হত ফর্সা কানের ধারটা যেন একটু লাল হয়ে উঠেছে কয়েক মুহূর্তের জন্য৷ গাল যেন একটু টোল খেল৷ হয়তো চুরি করে হেসেছিল একটু!

অব্যক্ত যন্ত্রণায় কাটল মাসচারেক। আমার সবকিছু শিকেয় উঠল৷সেদিন প্রচণ্ড বৃষ্টি৷ বাংলার কোচিং ক্লাসে কেউই বিশেষ আসেনি৷ কিন্তু, আমার তো কামাই নেই। লোডশেডিং৷ মোমবাতি জ্বলছে৷ স্যর একটা ডিকটেশন দিলেন। ইশ! সুরঞ্জনাটা এমন দিনে আসেনি! লেখা শেষ হতে হন্তদন্ত হয়ে ঢুকল সুরঞ্জনা৷ চুলে বিন্দু বিন্দু জলের রেণু মোমবাতির আলোয় হিরের মতো জ্বলছে৷ হরিমাধব স্যর আমাকে বললেন সুরঞ্জনাকে আমার খাতাটা দিতে, যাতে ও নোটটা লিখে নিতে পারে৷ উফ্, কী ভাগ্য! খাতা তো দিলামই, নোটের শেষে লিখে দিলাম — পড়া শেষ হয়ে গেলে একটু দাঁড়াবি? একটা কথা বলতেই হবে৷ কাউকে কিন্তু কিছু বলিস না।

পড়া মাথায় উঠল৷ সারাক্ষণ ঢিপ ঢিপ বুকে আড়চোখে সুরঞ্জনাকে দেখতে থাকলাম৷ উফ্, কী অসহ্য রকমের ভাবলেশহীন মুখ! ও একটু পরে আমাকে ডাকল নাম ধরে৷ এই প্রথম ও আমায় ডাকল। বেশ জোরেই৷ যেন এ ভাবেই ও আমায় ডাকে৷ খাতাটা ফেরত দেবার সময় অস্ফুটে বলল, ‘বাড়িতে গিয়ে খুলিস৷’

ইতিমধ্যে সুরঞ্জনার বাবা দরজায় হাজির৷ হরিমাধববাবু শশব্যস্ত হয়ে বাইরে গিয়ে ওঁর সাথে কথা বললেন৷ ভেতরে এসে বললেন, ‘সুরঞ্জনা, তুমি এ বার যাও মা। আজ আর তোমায় বেশিক্ষণ আটকাব না৷’

যাঃ, চলে গেল? ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থাকলাম ওর যাওয়ার পথের দিকে। বাড়ি ফিরে দুরুদুরু বুকে খাতাটা খুললাম৷ আমার লেখাগুলো ও হিজিবিজি করে কেটে দিয়েছে, যেন পড়া না যায়৷ তলায় লেখা, ‘আমরা কাল বালুরঘাট চলে যাচ্ছি। বাবার ট্রান্সফার হয়ে গেছে৷ ভালো করে মাধ্যমিক দিস৷ এ সব আর ভাবিস না৷ পড়া হয়ে গেলে লেখাটা কেটে দিস৷ ঠিক আমি যে ভাবে কেটেছি৷’

Leave a comment

Your email address will not be published.