logo

সোমেনের ওমর থাকলে আমারও তাড়িবাবা আছে

  • August 16th, 2022
Memoir

সোমেনের ওমর থাকলে আমারও তাড়িবাবা আছে

সুমন চট্টোপাধ্যায়

‘সোমেন যেন মনে রাখে ওর একটা ওমর থাকলে আমারও একটা তাড়িবাবা আছে।’

সোমেন মিত্রর গোষ্ঠীর সঙ্গে তাঁর ছেলেপিলেদের প্রবল ক্যালাকেলির ঘটনার পরে সুরেন ঠাকুর রোডে নিজের অফিস ঘরে বসে উত্তেজনায় কাঁপতে কাঁপতে সুব্রত মুখোপাধ্যায় প্রকাশ্যে এই হুমকি দিয়েছিলেন। তারপর কত কত বছর কেটে গেল, আমি বৃদ্ধ হলাম, সুব্রতদা তো ওপরতলার টিকিটই কেটে ফেলল, তবু পুরোনো সিনেমার ডায়লগের মতো এটিও আমার স্মৃতিতে গাঁথা হয়ে রয়ে গেছে।

আজকের প্রজন্ম ওমর অথবা তাড়িবাবার নামই শোনেনি, শোনার কথাও নয়। তবে একটা সময় ছিল যখন কাগজের রিপোর্টারদের মুখে এই দু’টি নাম উচ্চারিত হতো ঘন ঘন, কিছুটা তাদের পেশি শক্তির সুখ্যাতির জন্য, কিছুটা তাদের পৃষ্ঠপোষকের সৌজন্যে। আসুন যৎপরোনাস্তি সংক্ষেপে এদের পরিচয় করিয়ে দিই।
ওমরের চেহারাটা এখনও চোখের সামনে ভাসে। দীর্ঘদেহী পাঠান, লম্বায় প্রায় সোয়া ছ’ফুট, গালে জমাটি চাপদাড়ি। কিচ্ছুটি করার দরকার নেই, একবার সামনে এসে দাঁড়ালেই যথেষ্ট। তাড়িবাবার চেহারায় ওমরের কৌলীন্য ছিল না, গাত্রবর্ণটি চকচকে, স্বভাবটিও হাসিখুশি। ওমর ‘ছোড়দা’ মানে সোমেন মিত্রর বশংবদ, তাড়িবাবা ‘সুব্রতদার’।

আরও অনেক কিছুর মতো কালে কালে কুলীন মস্তানেরাও এই শহর থেকে অদৃশ্য হয়ে গিয়েছে। ইদানিং কাগজে বা টেলিভিশন চ্যানেলে যে সব ‘দাদা’-দের নাম শোনা যায়, ওমর-তাড়িবাবার পাশে তাদের লালু-পঞ্চুর বেশি মনে হয় না। হাজি মস্তান, বরদারাজন, দাউদ ইব্রাহিম, ছোটা শাকিল, ছোটা রাজন গোত্রের ডন কলকাতায় কস্মিনকালেও ছিল না, ফলে তা নিয়ে মনস্তাপ করে লাভ নেই। তবে দুধের স্বাদ ঘোলে মেটানোর মতো ওমর-তাড়িবাবারা তো অন্তত ছিল! এমন বদনসিব আমাদের, শুধু টাটা, বিড়লা, আম্বানি, বাজাজ, আদানিরাই নন, পাতে দেওয়ার মতো মস্তানরাও আর এই শহরটাকে কারবারের উপযুক্ত বলে মনে করে না। এই বেনে-বনে তাই কোথাও একটা বিশালবপু কেষ্ট ঠাকুর কোথাও আবার একটা হ্যাংলা আরাবুলই রাজা!

একটি খুনের মামলায় দোষী সব্যস্ত হওয়ার পরে ওমর প্রাণ বাঁচাতে দেশান্তরী হয়েছে, অনেক কাল হয়ে গেল। তাড়িবাবাও কোথায় হারিয়ে গেল, কেউ তার হদিশ দিতে পারে না। তাদের বিহনে কলকাতার অপরাধ জগতে অনেককাল ধরেই লোডশেডিং।

গুন্ডা-মস্তানের পৃষ্ঠপোষণা শতাব্দী প্রাচীন কংগ্রেস দলের সনাতন ঐতিহ্য। ১৯৩০-এর দশকে বঙ্গীয় প্রাদেশিক কংগ্রেসে সুভাষচন্দ্র বসু আর যতীন্দ্রমোহন সেনগুপ্তের গোষ্ঠী-বিবাদ প্রায়শই লাঠালাঠিতে নেমে আসত, একজনের চ্যালাচামুণ্ডারা অন্যজনের সভা ভণ্ডুল করে দিচ্ছেন এমন নজিরও আছে বেশ কিছু।

সোজা আঙুলে ঘি না উঠলে লাঠ্যৌষধির প্রয়োগ যে বিশেষ জরুরি, দেশবরেণ্য নেতারাও সে কথা জানতেন, মানতেন এবং সময়ে সময়ে প্রয়োগও করতেন। স্বাধীনতার পরের দশকগুলিতে মধ্য কলকাতার নামকরা গুন্ডাদের প্রায় সকলের অভিভাবক ছিলেন কোনও না কোনও কংগ্রেস নেতা— গোপাল পাঁঠা, ফাটা কেষ্ট কিংবা ইনু মিত্তির। তার পরে বেশ কিছু দিন এলাকা দাপিয়ে মস্তানি করতেন হেমেন মণ্ডল, করতে করতে একটা সময় তিনি অজিত পাঁজাকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে বসেছিলেন। আগ্রহী পাঠক ইচ্ছে করলে পুরোনো কাগজের পাতায় বাংলা মায়ের এই দামাল সন্তানদের ইতিবৃত্ত আরও বিশদে খুঁজে পাবেন।

সুব্রত-সোমেনের আগের প্রজন্মের নেতাদের মধ্যে মস্তানদের সবচেয়ে বড় আস্তাবলটি ছিল প্রফুল্লকান্তি ঘোষ ওরফে শত’দার। যুগান্তর-অমৃতবাজার খ্যাত বনেদি ঘোষ পরিবারের এই সদস্যটি ছিলেন অতি বর্ণময় চরিত্র, চিবিয়ে চিবিয়ে কথা বলতেন, ওপর ওপর দেখলে মনে হতো ধর্মপ্রাণ বৈষ্ণব। যশস্বী আইনজীবী, প্রবীণ কংগ্রেস নেতা অশোক সেনের সঙ্গে শত ঘোষের নিত্য আকচা-আকচি ছিল কংগ্রেস বিটের রিপোর্টারদের বড় আমোদের বস্তু। আনন্দবাজারের দেবাশিস ভট্টাচার্যের দৈনন্দিন কাজই ছিল নারদের ভূমিকায় নেমে দু’জনের মুখ থেকে পরস্পর বিরোধী মন্তব্য বের করে নেওয়া। যেমন অশোকবাবু বললেন, ‘শত আবার একটা মানুষ নাকি, রোয়াকের কাক।’ শুনেই শতবাবুর জবাব, ‘বসন্তের কোকিল হওয়ার চেয়ে কাক হওয়া ভালো নয় কি?’

কংগ্রেস দলে নেতা-মস্তানের সম্পর্কের প্রেক্ষাপটটি মাথায় রাখলে সুব্রত মুখোপাধ্যায় বা সোমেন মিত্র কাউকেই কাঠগড়ায় তোলা উচিত হবে না, কেন না তাঁরা মহাজ্ঞানী, মহাজনদের পদাঙ্ক অনুসরণ করেছিলেন মাত্র। তবে দু’জনের কর্মপদ্ধতি ছিল সম্পূর্ণ বিপরীত, সোমেন মিত্র চুপচাপ, সাংবাদিকরা গেলে মিচকি হাসেন, কথা বলেন মেপে মেপে, ভেবে চিন্তে। সুব্রতর স্টাইল ছিল ঠিক উল্টো। অনেক সময় মনে হতো বর্ষণের চেয়ে গর্জনটাই হচ্ছে বেশি। সোমেনবাবুর রাজনীতি খবরের কাগজ নির্ভর ছিল না, সুব্রতবাবু আবার কাগজ ছাড়া এক পা চলতে পারেন না। রোজ বিকেলে বাড়ির সাংবাদিক বৈঠকে তিনি গরম গরম কথা বলতেন, প্রতিপক্ষকে নিয়ে মস্করা করতেন, সঙ্গে সঙ্গে এই ভবিষ্যদ্বাণীটিও করে দিতেন আগামীকাল তাঁর কোন মন্তব্যটি ছাপা হবে, কোনটি হবে না।

জ্যোতিবাবুর মতো আনন্দবাজারের প্রাক্তন সম্পাদক অভীক সরকারের খুলে আম প্রশ্রয় পেতেন সুব্রতবাবু। কাগজের অফিসে এসে সম্পাদকের ঘরে সুব্রতবাবু ঘণ্টার পর ঘণ্টা আড্ডা মারছেন, এ তো আমার স্বচক্ষে দেখা। একদিকে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী অন্যদিকে আনন্দবাজারের সম্পাদকের যিনি প্রসাদধন্য বাংলার রাজনীতিতে তিনি তো একটু বাড়তি রোয়াব দেখাবেনই। অবশ্য সুব্রতবাবুর একটা বড় গুণ ছিল, তাঁর অনুগামীরা কোথাও বাওয়াল করলে তিনি নিজেকে আড়াল করার চেষ্টা করতেন না। বরং বুক বাজিয়ে বলতেন, ‘আমার ছেলেরা মেরেছে? বেশ করেছে। আমাদের যদি কেউ মারে তাহলে কি আমরা তাদের দিকে ফুল ছুড়ব?’

আশির দশকে সুব্রতবাবুর গোষ্ঠী রাজনীতির দুই প্রধান স্তম্ভ ছিলেন সুশোভন বসু আর প্রদীপ ঘোষ, আমরা আড়ালে ডাকতাম শুম্ভ আর নিশুম্ভ। প্রদীপবাবু রেলে চাকরি করতেন, সেখানেই সুব্রতবাবুর নেতৃত্বে ট্রেড ইউনিয়ন করতেন। সোমেন মিত্রর ডেরায় বসে সুব্রতর অনুগামী হওয়ার কারণে তিনি বোধহয় প্রাপ্যের অতিরিক্ত গুরুত্বও পেতেন। সুশোভনের সে সমস্যা ছিল না, তিনি থাকতেন দক্ষিণ কলকাতার পদ্মপুকুর রোডে, সুব্রতবাবুর নাকের ডগায়। প্রদীপবাবু মিডিয়ার সঙ্গে পারতপক্ষে মেলামেশা করতেন না, সুশোভনবাবু ছিলেন একেবারে বিপরীত। সুব্রত-শিবিরের যাবতীয় গোপন খবরের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য সোর্স ছিলেন তিনিই। লম্বা, সুঠাম চেহারা, গড়পড়তা বাঙালির মধ্যে চোখে পড়ার মতোই। সর্বদা জামার ওপরের দুটো বোতাম খোলা থাকত এ কথা জানান দিতে, হাম কিসিসে কম নেহি। এক হাতের কব্জিতে মোটা স্টিলের বালা, অন্য হাতের তালুতে বিদেশি ব্র্যান্ডের সিগারেট। সূর্যোদয় থেকে মাঝরাত, সুব্রত যেখানে সুশোভনও সেখানে। বন্ধুবৎসল, আমুদে, হাসিখুশি সুশোভনের সমস্যা ছিল একটাই। কথা বলতে গেলেই এত তোতলাতে শুরু করতেন যে দু’মিনিটের বাক্যালাপ পাঁচ মিনিটের আগে শেষ করা অসম্ভব ছিল। দিল্লিতে বদলি হওয়ার আগে কলকাতায় রিপোর্টারি করার সময় সুশোভনবাবুর সঙ্গে আমার ব্যক্তিগতস্তরে এক ধরনের নৈকট্য গড়ে উঠেছিল। বড্ড ভালো লাগতো দিলখোলা, পরোপকারী এই মানুষটাকে।

এই দুই শুম্ভ আর নিশুম্ভ ছিলেন সুব্রত গোষ্ঠীর ঠ্যাঙাড়ে বাহিনীর মূল পান্ডা। গোলমাল যেখানেই হোক না কেন এদের দু’জনের একজন সেখানে দাঁড়িয়ে ক্যালাকেলি পরিচালনা করতেন। বেশিরভাগ সময়েই সুশোভনবাবু। ‘অ্যাকশনে’ নামার জন্য তাঁর মনটা সর্বদা উসখুস করত, মারামারি, ভাঙচুর, আইন অমান্য করে পুলিশি হেফাজত, এ সবের একটা না হলে সে রাতে সুশোভনবাবুর রাতে নিদ্রায় ব্যাঘাত ঘটত। আশির দশকে সুব্রতবাবু নিজে আর রাস্তায় নেমে গন্ডগোল পাকাতেন না, দায়িত্বটা তিনি এই দুই ‘স্টর্ম-ট্রুপারের’ হাতে ছেড়ে দিয়েছিলেন।

সোমেন-সুব্রতর দ্বন্দ্ব আসলে ছিল দুই উপগ্রহের লড়াই। সোমেনবাবু ছিলেন বরকত সাহেবের প্রধান স্তম্ভ, সুব্রতবাবু প্রণব মুখোপাধ্যায়ের। প্রণববাবুকে গাল না পাড়লে বরকত সাহেবের পেটের ভাত হজম হতো না। কিন্তু প্রণববাবু কোনও প্ররোচনাতেই পা দিতেন না। একবার প্রদেশ কংগ্রেসের অফিসে একটি বিচ্ছিরি ঘটনা ঘটল। প্রণববাবু গাড়ি থেকে নেমে সিঁড়ি বেয়ে উঠছেন, হঠাৎ সোমেনবাবুর দলবল এমন ধাক্কাধাক্কি শুরু করে দিল যে দেশের অর্থমন্ত্রীর ধুতির কাছা গেল খুলে। সুব্রতবাবুর দলবল ব্যাপারটা বোঝার আগেই দুর্ঘটনাটি ঘটে গেল, তারপর শুরু হল বেদম মারপিঠ।

কংগ্রেস নেতারা কেন যে ধুতি পরতেন! (চলবে)


Leave a comment

Your email address will not be published.