logo

আমার দলের গোরুদের বোঝাই কী করে

  • August 16th, 2022
Memoir

আমার দলের গোরুদের বোঝাই কী করে

সুমন চট্টোপাধ্যায়

কেস খেলাম, ক্ষুর খাইনি। তাছাড়া সুব্রতদার স্বভাবটাও ছিল ওই রকম, রেগে গেলে যা মুখে আসে বলে দিতেন, তারপরেই সেই মিষ্টি হাসি। অল্প বয়স থেকেই মাথার চুল পাতলা হতে শুরু করেছিল, গোঁফ-জোড়াটির প্রতি দুর্বলতা এতটুকুও কমেনি। ভুল বোঝাবুঝি মিটে গিয়ে প্রথমে সু-সম্পর্ক, তারপরে গভীর বন্ধুতা তৈরি হতে বেশি সময় লাগেনি।

ধীরে ধীরে সুব্রতদা বুঝেছিলেন, খবর পেলে আমি বাপকেও রেয়াৎ করব না। আমার একটি বই প্রকাশ অনুষ্ঠানে এসে নিজের ভাষণে বলেছিলেন, 'খবর পেলে ও ব্যক্তিগত সম্পর্কের ধার ধারে না। যে প্রিয়দার সঙ্গে ওর দাদা-ভায়ের সম্পর্ক তাকেও ও কী গালটাই না দিয়েছে! ওকে নিয়ে আমরা সবাই তাই একটু ভয়ে ভয়ে থাকি।’

ইন্দিরা গান্ধীর আকস্মিক হত্যাকাণ্ডের পরে দেশের সর্বত্রই ইন্দিরাপন্থীরা কংগ্রেসের অন্দরে কিছুটা কোনঠাসা হয়ে পড়েছিলেন। বাংলায় প্রণব মুখোপাধ্যায়, বরকত সাহেব, সোমেন মিত্র, সুব্রত মুখোপাধ্যায়ের মতো নেতারাও। সুব্রতবাবুর চরিত্রের একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য ছিল বিপর্যয়ে ভেঙে না পড়ে তিনি ঠিক নিজেকে ব্যস্ত রাখার একটা উপায় বের করে নিতেন, সেটা যদি খো-খো বা হা ডু ডু সংগঠনের পরিচলনা হয়, তাও সই। রাজনীতি করতে গেলে সু-সময় আর দুঃসময় পিঠোপিঠি আসবে-যাবে অনেকেই তা মেনে নিতে পারেন না। সুব্রত মুখোপাধ্যায় পেরেছিলেন। এটা অবশ্যই জাত-রাজনীতিকের গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র লক্ষণ।

১৯৮৪-র ৩১ অক্টোবর সূচনা করেছিল তেমনই এক দুর্যোগপূর্ণ পর্বের। ক্ষমতায় রাজীব গান্ধী, সচেতন ভাবেই মায়ের ঘনিষ্ঠ অনুগামীদের সঙ্গ তিনি এড়িয়ে চলেন। দিল্লিতে সুব্রতবাবুর প্রধান মুরুব্বি প্রণব মুখোপাধ্যায় তখন অপাংক্তেয়, যত দিন যাচ্ছে প্রণববাবুর ব্যক্তিগত সঙ্কট গভীর থেকে গভীরতর হচ্ছে। মূল স্রোতের কংগ্রেস রাজনীতিতে আপাতত কলকে পাওয়া যাবে না বুঝতে পেরে সুব্রতবাবু তখন সর্বান্তকরণে ট্রেড ইউনিয়ন রাজনীতির দিকে ঢলে পড়লেন। এমনিতেই তিনি আইএনটিইউসি-র রাজ্য সভাপতি ছিলেন। সেই পদকে ব্যবহার করে বেড়ে গেল তাঁর সক্রিয়তা। সিপিএমের শ্রমিক সংগঠনের সঙ্গে হাত মিলিয়ে শ্রমিকদের দাবি দাওয়া নিয়ে তাঁর জঙ্গি আন্দোলন এই সময়েই। তাঁকে কেন্দ্র করে বিতর্কও সেই কারণেই।

বিতর্ক কিছুটা স্তিমিত হলে পরে একদিন সুব্রতবাবু আত্মপক্ষ সমর্থনে আমাকে বলেছিলেন, 'আমি ট্রেড ইউনিয়ন করি, আমাদের আন্দোলন শ্রমিকদের দাবি-দাওয়া নিয়ে, মালিকদের বিরুদ্ধে, কংগ্রেসের বিরুদ্ধে নয়। আর পশ্চিমবঙ্গে ট্রেড ইউনিয়ন করব অথচ সিটুকে অস্পৃশ্য করে রাখব, এটা কোনও কৌশলই হতে পারে না। আমি সিটুর সঙ্গে রাজনৈতিক ঐক্য করছি না, তাদের ঘাড়ে চেপে বাংলায় আমাদের সংগঠনটাকে প্রাসঙ্গিক রাখার চেষ্টা করছি মাত্র। আমার দলের ‘গোরু’-গুলো যদি সে কথা না বোঝে, আমি কী করতে পারি?’

গোরু ছিল সুব্রতবাবুর পছন্দের গালাগাল। তখন দেশে এই চতুষ্পদ প্রাণীটির নাম-মাহাত্ম্য এমন ভাবে প্রচারিত হয়নি ভাগ্যিস! বেঁটে-খাটো মানুষ প্রণব মুখোপাধ্যায় অত বড় প্রাণীকে সামলাতে পারবেন না বলেই বোধহয় কারও ওপর রেগে গেলে তাকে ‘ছুঁচো’ বলে সম্বোধন করতেন। দুই মুখোপাধ্যায়ের এই দুই গালাগাল নিয়ে তখন আমাদের মধ্যে বিস্তর হাসি-ঠাট্টা হতো।

সুব্রত মুখোপাধ্যায়ের চলে যাওয়ার পরে আশ্চর্য হয়ে দেখছি তাঁর ট্রেড ইউনিয়ন সত্ত্বা নিয়ে কার্যত কোনও আলোচনাই হচ্ছে না। তার একটি কারণ তিনি বহুদিন হল ট্রেড ইউনিয়ন রাজনীতি থেকে নিজেকে দূরে সরিয়ে রেখেছিলেন। সম্ভবত তার চেয়েও বড় কারণ, এই বাংলায় কৃষক-শ্রমিক আন্দোলন কবরস্থ হয়ে গিয়েছে অনেক দিন। এ এক নতুন পৃথিবী যেখানে চাষ বলুন কিংবা চাকরি সব কিছুই চুক্তি-ভিত্তিক, প্রতিবাদ, প্রতিরোধ সব কিছুই অর্থহীন। এই বাংলায় আগে জঙ্গি শ্রমিক আন্দোলনের উৎপাতে বহু শিল্প বন্ধ হয়ে গিয়েছে, অনেকে রাজ্য থেকে পাততাড়ি গুটিয়েছে, দূরপনেয় দুর্নাম লেগেছে পশ্চিমবঙ্গের গায়ে। সেই পশ্চিমবঙ্গে এখন শ্মশানের নিস্তব্ধতা তবু হে শিল্প তোমার দেখা নাই রে, তোমার দেখা নাই। মাঝে মাঝে মনে হয় আজকের রাজনীতিতে সুব্রতবাবুর প্রজন্ম অনেকটাই যেন ডাইনোসরের মতো।

ট্রেড ইউনিয়নের কাজে আশির দশকের শেষভাগে সুব্রতবাবু নিয়মিত দিল্লি আসতেন। আইএনটিইউসি-র সর্বভারতীয় নেতৃত্বের সঙ্গে তাঁর খুবই ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। প্রায় প্রতি বছর তিনি সুইৎজারল্যান্ডের জেনেভায় যেতেন আইএলও-র বাৎসরিক অধিবেশনে যোগ দিতে। একবার গেলে অন্তত মাস খানেক থেকে যেতেন, কখনও কখনও ছন্দবাণীদিকেও নিতেন সঙ্গে। সেখান থেকে সুব্রতদা দেশে প্রিয়জনদের চিঠি লিখতেন, আমার কাছেও বেশ কয়েকটি এয়ার-মেইল এসেছিল। একটি চিঠির কয়েকটি লাইন আমার এখনও মনে আছে। 'জেনিভা লেকের ধারে বসে আছি, দুপুরবেলা, অথচ চারপাশটা একেবারে নিঃস্তব্ধ। এত শান্তি, এমন নিস্তব্ধতা একটা বিন্দুর পরে আমার ভালো লাগে না, মনে হয় কেউ যেন গলা টিপে ধরছে। আমি মাঠেঘাটে যখন-তখন নেমে পড়া রাজনীতির লোক, শান্তির চেয়ে অশান্তি আমার বেশি পছন্দ।’ সুব্রতদা’র এমন দার্শনিক সুলভ মনের পরিচয় আমি তার আগে বা পরে কখনও পাইনি। অনেক পরে নিজের একটা কবিতার বই সুব্রতদা আমাকে উপহার দিয়েছিলেন। অপাঠ্য। কেন জানি না কবিতা লেখার ভাইরাস কেন কংগ্রেস নেতাদের আক্রান্ত করত। সুব্রতদার গুরু প্রিয়রঞ্জনও কবিতা লিখতেন, সেও একেবারেই পাতে দেওয়ার মতো নয়।

সুব্রত মুখোপাধ্যায়ের গায়ে ‘তরমুজের’ লেবেল সেঁটে যাওয়ার আরও একটি কারণ ছিল, তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসুর সঙ্গে তাঁর অতি-ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিগত সম্পর্ক। মহাকরণে অথবা বিধানসভায় মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করতে তাঁর আগাম অ্যাপয়েন্টমেন্ট লাগত না, প্রয়োজনে দরজা ঠেলে ঘরে ঢুকে যেতে পারতেন। জ্যোতিবাবুর নাম শুনলেই দুটো হাত কপালে উঠত সুব্রতদার, যেন তিনি দেবতার মতো আরাধ্য। আবেগ প্রবণ মানুষ ছিলেন না জ্যোতি বসুও, তবু সুব্রতর প্রতি তাঁর বিশেষ স্নেহ আর দুর্বলতা তিনি পুরোটা গোপন রাখতে পারতেন না। অন্যেরা যে কাজ করলে তিনি সোজা থানার লক-আপে পুড়ে দিতেন, সুব্রতবাবু সে কাজ করলে তিনি রসিকতা করে বিষয়টি উড়িয়ে দিতেন। ১৯৭৯ না ১৯৮০ সালটা ঠিক মনে নেই, সৌদি আরবে একটা ভয়ঙ্কর কাণ্ড ঘটেছিল। সৌদি রাজ-পরিবার বিরোধী সশস্ত্র জঙ্গিরা হঠাৎ অভ্যুত্থান ঘটিয়ে মক্কায় ইসলামের সবচয়ে পবিত্র স্থানটির দখল নিয়ে নেয়। বেধে যায় যুদ্ধ। এই ঘটনার প্রতিবাদে কলকাতার পার্কসার্কাস অঞ্চলে সুব্রতবাবুর নেতৃত্বে একদল লোক কয়েকটি বাস আর ট্রামে আগুন ধরিয়ে দেয়। মহাকরণে তাঁর কানে খবরটি পৌঁছলে জ্যোতিবাবু মন্তব্য করেন, ’সুব্রত আবার কবে থেকে মুসলমান হল?’

জ্যোতি-সুব্রতর এই সম্পর্কের মধ্যে অনেকে বিধান-জ্যোতির সম্পর্কের ছায়া দেখতেন। বিধান রায়ের আমলে কংগ্রেস ছিল একচ্ছত্র, বিধানসভায় বিরোধীদের উপস্থিতি নগন্য। এমন একটা প্রতিকূল পারিপার্শ্বিকের মধ্যে দাঁড়িয়েও জ্যোতিবাবু বিধান রায়ের সরকারের তুলোধনা করতেন। অথচ বিধানসভার অধিবেশন শেষ হলেই জ্যোতিবাবুর ডাক পড়ত বিধানবাবুর ঘরে। এই রসায়নের মধ্যে অনেকেই বিধানবাবুর অপত্য স্নেহ দেখতে পেতেন। সুব্রত মুখোপাধ্যায় সম্পর্কে জ্যোতিবাবুর মনোভাবে কি সেই স্নেহই ছিল নির্নায়ক? সংসদীয় গণতন্ত্রে বিরোধীকে প্রাপ্য সম্মান জানানোর শিক্ষা বিধানবাবুর কাছ থেকে জ্যোতিবাবু পেয়েছিলেন। হতে পারে অনেক বছর পরে সেই ইতিহাসেরই পুনরাবৃত্তি হয়েছিল। (চলবে)

Leave a comment

Your email address will not be published.