logo

ইনাম নয় সম্ভ্রম

  • August 13th, 2022
Suman Nama

ইনাম নয় সম্ভ্রম

সুমন চট্টোপাধ্যায়

আমি মন্তব্যটি স্বকর্ণে শুনিনি, শিল্পী শুভাপ্রসন্ন আমায় বলেছিলেন।
সক্রিয় রাজনীতিকে আলবিদা জানিয়ে প্রণব মুখোপাধ্যায় রাষ্ট্রপতি ভবনে প্রবেশের পরে বেশ কিছু নতুন রীতি-নীতি চালু করেছিলেন। তার মধ্যে একটি হল দেশের নানা প্রান্ত থেকে গায়ক, লেখক, শিল্পী, চিত্রকর, ভাস্কর প্রভৃতিদের ওই প্রাসাদে আমন্ত্রণ জানানো। তাঁরা রাষ্ট্রপতি ভবনের অন্দরে একটি সপ্তাহ কাটাবেন, যেমন খুশি তেমন ভাবে সময় ব্যয় করবেন, ফেরার আগে একটি নৈশভোজে ডাক পাবেন খোদ রাষ্ট্রপতির কাছ থেকে। কলকাতা থেকে বেশ কয়েকজন এমন আমন্ত্রণ পেয়েছিলেন, শুভাপ্রসন্ন তাঁদেরই একজন।

রাষ্ট্রপতি ভবনের পরতে পরতে ইতিহাস, চেয়ার, টবিল, খাট, পালঙ্ক সবেতেই ইতিহাসের ছোঁয়া। আমার বড় আহ্লাদ ছিল রাষ্ট্রপতি ভবনের গ্রন্থাগারে কয়েকটি দিন কাটানো, লাইব্রেরি তো নয়, সাক্ষাৎ সোনার খনি। আমার কপাল মন্দ, প্রণববাবু আমাকে আতিথ্য পাওয়ার যোগ্য মনে করেননি, হ্যাংলামি করলে আমিও হয়তো আমন্ত্রণ পেতাম, আত্মসম্মানে ধাক্কা লাগে বলে সে কাজটি করে উঠতে পারিনি। এই বিষম বস্তুটিকে রক্ষা করতে গিয়ে পারিনি তো আরও কত কিছুই।

মনের মতো লোকের সঙ্গে হাত-পা ছড়িয়ে বসে বিশুদ্ধ আড্ডা মারতে প্রণববাবু খুবই ভালবাসতেন, সুশিক্ষিত, তার্কিক, আড্ডাবাজ বাঙালি রাজনীতিককূলের তিনিই বোধহয় শেষ প্রতিনিধি। শুভাপ্রসন্নও আড্ডাপ্রিয়, ফলে ধরে নেওয়া যেতেই পারে দুই খর্বকায় বঙ্গজ ব্রাহ্মণের সেদিনের খোশগপ্পো ভালোই জমেছিল। কথায় কথায় আমার প্রসঙ্গ উঠেছিল। স্বাভাবিক। কেন না প্রণববাবুর সঙ্গে আমার ব্যক্তিগত সম্পর্কের কথা শুভাপ্রসন্নর জানা ছিল। তাছাড়া ‘এই সময়’-এর রবিবারোয়ারিতে তখন প্রণববাবুকে নিয়ে আমার ধারাবাহিক লেখা প্রকাশিত হচ্ছে। ঘটনাচক্রে সেই লেখা যখন বই হয়ে বের হল (প্রথম নাগরিক, প্রকাশক-কারিগর) প্রণববাবু তখন আর রাষ্ট্রপতি নন। তাঁর হাত দিয়েই বইটির আনুষ্ঠানিক প্রকাশ ঘটেছিল, তাও সেই শুভাপ্রসন্নের আর্টস একর-এর ভিড়ে ঠাসা প্রেক্ষাগৃহে।

আমাকে নিয়ে দু’জনের সংলাপের বিশদ বিবরণ শুভাপ্রসন্ন দেননি, আমি জানতেও চাইনি। আমার সম্পর্কে করা প্রণববাবুর যে মন্তব্যটি তাঁর কানে বেজেছিল এবং তাৎপর্যপূর্ণ মনে হয়েছিল, কেবল সেটিই আমাকে বলেছিলেন। ‘সুমন সম্পর্কে একটি কথা সর্বদা মনে রাখবেন শুভাবাবু, ও কিন্তু কারও লোক নয়।’ একেবারে অভ্রান্ত মূল্যায়ন, শুনে আমার বড় আহ্লাদ হয়েছিল, মনে হয়েছিল সাংবাদিক হিসেবে এ আমার মহার্ঘ প্রাপ্তি।
রাজনীতিকদের চরিত্রধর্মই হল সাংবাদিকদের মধ্যে ‘নিজের লোক’ (পড়ুন সেবক) অন্বেষণ, এমন লোক যার ওপর চোখ বন্ধ করে নির্ভর করা যায়, তার চেয়েও বড় কথা যে কেবল ভালোটা দেখবে আর মন্দটা দেখেও না দেখার ভান করবে। অর্থাৎ দলের কর্মীর চেয়েও সে অনুগত হবে, এমন কোনও কাজ করবে না যাতে নেতা অথবা নেত্রী বিপদে পড়ে যান বা তাঁকে নিয়ে অবাঞ্ছিত বিতর্ক শুরু হয়। যৎপরোনাস্তি সংক্ষেপে রাজনীতিকদের ‘নিজের লোক’ হওয়ার গুণাবলী এটাই।

এমন পেট্রন-ক্লায়েন্ট সম্পর্কের ‘সুফল’ দু’তরফই পায়। আনুগত্যের পারিতোষিক হিসেবে কলাটা-মূলোটা তো মিলবেই, পাওয়া যেতে পারে আরও অনেক কিছু- আত্মীয়-স্বজনের চাকরি-বাকরি, সরকারি পদ, বিবিধ গুরুত্বপূর্ণ কমিটির সদস্যপদ ইত্যাদি এবং ইত্যাদি। প্রাপ্তির বহরটা একান্ত ভাবে নির্ভর করে প্রশ্নাতীত বিশ্বাস আর আনুগত্যের গভীরতার ওপর। ক্ষমতাবান ও প্রভাবশালী নেতার নিজের লোকের দৈনন্দিন জীবনও চলে ফাস্ট ট্র্যাকে, তিনি যেখানেই কড়া নাড়বেন, স্কুল, কলেজ, হাসপাতাল, যে কোনও সরকারি অফিস অথবা পুলিশের কার্যালয়, দরজা খুলে যাবে চিচিং ফাঁক হয়ে, সাদর অভ্যর্থনা পাবেন একমাত্র মেয়ের জামাইয়ের মতো। ক্ষমতার বলয়ে ঘুরঘুর করতে কাদের দেখা যাচ্ছে বিদ্যুতের গতিতে সেই বার্তা প্রয়োজনীয় সব জায়গায় পৌঁছে যায়। কাছের লোক হওয়ার সবচেয়ে বড় প্রাপ্তিটি অবশ্য ইনট্যানজিবল। নেতার প্রভায় উদ্ভাসিত হতে পারলে নিজেকে বেশ একটা হনু মনে হয়, নিজেকে বেশ ওজনদার লাগে, মনে হয় চাইলে আমিও দাক্ষিণ্য বণ্টন করতে পারি কিংবা লোকের মাথা হাতে কাটতে পারি। বলা কঠিন দেওয়া-নেওয়া-ফিরিয়ে দেওয়ার এই সমীকরণে কোন পক্ষের লাভ বেশি, দাতার না গ্রহীতার।
এতকাল ধরে সাংবাদিকতা করলুম, এত ভিআইপি-কে চিনলুম, এত অপবাদ সইলুম অথচ আজ পর্যন্ত সরকারি বদান্যতার যোগ্য বলে বিবেচিত হতেই পারলাম না। আমি কখনও কোনও সরকারি কমিটির সদস্য হইনি, এমনকী রিপোর্টারদের অ্যাক্রেডিটেশন দেওয়ার জন্য যে কমিটি আছে, যেটি পুরোটাই সাংবাদিকদের ব্যাপার, তারও নয়। ঈশ্বরের অপার করুণায় আমার কোনও আত্মীয়ের চাকরি অথবা অন্ন সংস্থানের জন্য সরকারের দরজায় কড়া নাড়ার প্রয়োজন হয়নি। বাম-অবাম কোনও জমানাতেই। 
পাইনির চেয়ে দেয়নি বলাটাই অধিকতর যুক্তিসঙ্গত। দেয়নি কারণ আমি সাংবাদিকতার নামে খাস-বেয়ারাগিরি করতে পারিনি, আমার আনুগত্য প্রশ্নাতীত নয়, আমি তাই বিশ্বাসযোগ্যও নই। আজ যদি কারও প্রশংসা করি কাল তাহলে তাঁকে তুলোধনা করার স্বাধীনতাটিও আমি যে কোনও মূল্যে রক্ষা করতে চেয়েছি। সেটা আমার কাছে যে কোনও ধরনের সরকারি মুষ্টিভিক্ষার চেয়ে অনেক দামি, শত প্রলোভন আর প্ররোচনাতেও যা বিকিয়ে দেওয়ার নয়। আমার কানে যখন খবর আসে স্রেফ হাত কচলে আর হ্যাঁতে হ্যাঁ মিলিয়ে কোনও মান্য-গণ্য-দেশবরেণ্য সাংবাদিক হেরিটেজের অ আ ক খ না জেনেও রাজ্য হেরিটেজ কমিশনের সদস্য হয়েছেন, আমি হাসব না কাঁদব বুঝে উঠতে পারিনি। উড়ো খই গোবিন্দায় নমঃ।

ইনামের চেয়ে সম্ভ্রমকে আমি যে আগাগোড়া বেশি গুরুত্ব দিয়েছি সমকালীন রাজনীতিকরা সকলেই কম-বেশি তা জানেন। নইলে আমি তাঁদের যত নিন্দা-মন্দ করেছি, কোথাও ছিদ্র পেলে তাঁরা আমাকে নাজিবুল্লার মতো ধর্মতলা মোড়ের ল্যাম্পপোস্টে ঝুলিয়ে দিতেন। পারেননি। এমনকী সংযম খুইয়ে রাজনীতিকরা কখনও-সখনও কোন সাংবাদিককে কত টাকা দিয়েছেন প্রকাশ্যে তা বলেও ফেলেন। এই তালিকায় আমার নামটি রাখার হিম্মত কোনও রাজনীতিকের নেই, ছিল না, থাকবেও না।

বিচক্ষণ প্রণব মুখোপাধ্যায় আমার সম্পর্কে শুভাপ্রসন্নর কাছে ওই মন্তব্য করার আগে নির্ঘাত নিজের অভিজ্ঞতাটির কথাও ভেবেছিলেন। তাঁর সঙ্গে আমার ব্যক্তিগত সম্পর্ক দারুন নিকট ছিল, নানা কারণে আমি তাঁর কাছে ঋণী, তাঁর পাণ্ডিত্য, মেধা, অভিজ্ঞতা আর বিশ্লেষণী ক্ষমতার সামনে মাথা ঝুঁকিয়েছি অনবরত। তাঁর অকুণ্ঠ প্রশংসা করে যেমন অনেক লেখা লিখেছি, তেমনি প্রয়োজনে তীব্র শ্লেষে তাঁকে বারেবারে বিদ্ধ করতেও আমার হাত কাঁপেনি। আনন্দবাজারে দিনের পর দিন নিজের কলামে আমি তাঁকে ‘কীর্ণাহারের ব্রাহ্মণকূলের ক্ষুদ্র অংশের নেতা’ বলে উপহাস করেছি। প্রণববাবু জানতেন, তাঁর লোক হলে আমি কিছুতেই একাজ করতাম না।

শুভাপ্রসন্ন বলেছেন, প্রণববাবুর মূল্যায়নের সঙ্গে তিনিও একমত।শুভাপ্রসন্ন বলেছেন, প্রণববাবুর মূল্যায়নের সঙ্গে তিনিও একমত।

Leave a comment

Your email address will not be published.