logo

জাপানে বাজার নেই জনমুখী রাজনীতির

  • August 16th, 2022
News

জাপানে বাজার নেই জনমুখী রাজনীতির

নিজস্ব প্রতিবেদন: বিশ্ব রাজনীতিতে গত দশক ছিল পপুলিজম বা জনমুখী রাজনীতির। ডোনাল্ড ট্রাম্পের ক্ষমতা দখল থেকে ব্রেক্সিট আন্দোলন। জার্মানি, ইটালি, ব্রাজিল, ইন্দোনেশিয়ায় পপুলিস্ট দলগুলির ক্ষমতাবৃদ্ধি। একটি সমীক্ষায় দাবি ছিল, ২০১০ সাল থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে জনমুখী নীতির ওপর ভর করে অন্তত ২০ জন রাষ্ট্রপ্রধান ক্ষমতায় এসেছেন। বিশেষ করে উন্নত অর্থনীতির দেশগুলিতে যেন জনমুখী রাজনীতির ঝড় বইছিল। ব্যতিক্রম জাপান। জি-সেভেন গোষ্ঠীর একমাত্র দেশ যেখানে দুনিয়াজোড়া প্রবণতার ছোঁয়া লাগেনি। রাজনৈতিক আবহ ছিল বরাবরের মতোই, শান্ত পরিতৃপ্তির। কেন এই ব্যতিক্রম? বিশেষজ্ঞদের আলোচনায় উঠে আসছে নানা ব্যাখ্যা।

জাপানের রাজনৈতিক ব্যবস্থার গভীরেই লুকিয়ে ব্যতিক্রমের বীজ, মনে করেন এক দল বিশ্লেষক। দীর্ঘদিন ধরে ক্ষমতায় থাকা শাসকদল লিবেরাল ডেমোক্র্যাটিক পার্টি (এলডিপি) ছাড়া জাপানের জাতীয় রাজনীতিতে কোনও শক্তিশালী বিকল্প নেই। বিভিন্ন দলের প্রতিনিধি রাজনীতিকরা প্রতি পদেই পরস্পরের সঙ্গে আপস করে চলতে বাধ্য হন। শাসকদলের ভিতরেও বিভিন্ন গোষ্ঠীর মধ্যে একই রকম বোঝাপড়া চলতে থাকে সব সময়। মত আলাদা হলেও হাতে হাত মিলিয়ে কাজ করতে হয়।

রাজনৈতিক এই সীমাবদ্ধতার শুরু তিন দশকেরও বেশি আগে। ১৯৮৭ সালে রেলের বেসরকারিকরণ করেন জাপানের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইয়াসুহিরো নাকাসোনে। আর সেই সঙ্গে শেষ হয় শ্রমিক ইউনিয়নের জমানা। বছর কয়েকের মধ্যেই শ্রমিকদের একমাত্র সংগঠন হিসেবে অবশিষ্ট থেকে যায় জাপানিজ ট্রেড ইউনিয়ন ফেডারেশন, যাদের দাবিদাওয়াগুলো ছিল নেহাতই নিরীহ। শ্রমিক ইউনিয়নের ক্ষমতা যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রধান বিরোধী দল জাপানিস্ট সোশ্যালিস্ট পার্টিও (জেএসপি) ভেঙে পড়ে। শেষ হয় তৃণমূল স্তর থেকে উঠে আসা প্রতিরোধ বা প্রতিষ্ঠানবিরোধী আন্দোলন মাথাচাড়া দেওয়ার সম্ভাবনা।

সেইনান গাকুইন ইউনিভার্সিটির অ্যাসোসিয়েট প্রোফেসর ক্রিস উইঙ্কলের মন্তব্য, ট্রাম্পের মতো কারওর পক্ষে জাপানে ক্ষমতায় আসা অসম্ভব। কারণ, জাপানের রক্ষণশীল রাজনৈতিক ব্যবস্থা সেই সুযোগ দেবে না। টেম্পল ইউনিভার্সিটির সহকারী অধ্যাপক মাইকেল কুকেক তার সঙ্গে যোগ করেছেন, শুধু কোটিপতি হওয়ার জোরে কেউ জাপানে রাজনৈতিক ক্ষমতার শীর্ষে পৌঁছে যাবেন, এমন সম্ভাবনা নেই। টাকা দিয়ে রাজনৈতিক দুনিয়ার টিকিট কেনা সেখানে অসম্ভব।

তবে শুধু রাজনৈতিক পরিস্থিতি দিয়েই কি সবটা ব্যাখ্যা করা সম্ভব? সেন্টার অফ আমেরিকান প্রোগ্রেসের এশিয়া বিষয়ক বিশেষজ্ঞ টোবিয়াস হ্যারিসের মতে, না। বরং তিনি জোর দিচ্ছেন জাপানের সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থার ওপর। জাতীয় পেনশন প্রকল্প, জাতীয় স্বাস্থ্যবিমা এবং বেকারদের আর্থিক সহায়তার মতো নীতিগুলির কারণে চরম দারিদ্র নেই। আর্থিক সমস্যা থাকলেও বেশিরভাগ জাপানি নাগরিক নিজেকে মধ্যবিত্ত বলে ভাবেন। উল্টোদিকে বিত্তশালীরা আমজনতার নাগালের বাইরে বিপুল বিলাসিতায় জীবন কাটাচ্ছেন, এ ছবিও সূর্যোদয়ের দেশে বিরল। কোটিপতির সংখ্যা নেহাত কম নয়, কিন্তু বৈভবের দেখনদারি সমাজ আদৌ ভালো ভাবে নেয় না। সাম্য ও পারস্পরিক সহযোগিতার গুরুত্ব সেখানে সর্বজনীন। ইদানিং অবশ্য জাপানের সোশ্যাল মিডিয়ায় জোকিয়ু কোকুমিন, বা ‘উচ্চতর পর্যায়ের নাগরিক’ বলে একটা কথা চালু হয়েছে। কিন্তু বাস্তব সমাজচিত্র অনুযায়ী সাধারণ মানুষ আর ধনকুবেরদের একই সম্প্রদায়ের অংশ ভাবায় কোনও খটকা নেই।

আর্থিক ক্ষমতার ভিত্তিতে সামাজিক বিভাজন যেমন নেই, জাপানে খুঁজে পাওয়া যাবে না শহর বনাম গ্রামের চেনা সমীকরণও। উত্তর আমেরিকা বা ইউরোপের দেশগুলোয় গ্রামীণ এবং নাগরিক জনজীবনের মধ্যে অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক ফারাকটা খুব স্পষ্ট। কিন্তু জাপানে শাসকদল এলডিপির জনসমর্থনের অন্যতম ভিত্তিই হল গ্রামগুলি। জার্মানির ডুইসবুর্গ-এসেন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আক্সেল ক্লাইনের বিশ্লেষণ, গ্রাম ও ছোট শহরগুলিকে সচল রাখতে এলডিপি সরকার সক্রিয়। তাই ওই সব অঞ্চলের মানুষ নিজেকে অবহেলিত ভাবতে পারেন না। এক ধাপ এগিয়ে হ্যারিসের দাবি, জাপানে যদি গ্রাম বনাম শহর প্রতিদ্বন্দ্বিতা কখনও হয়, তাহলে সেটা হবে গ্রামীণ অভিজাতদের বিরুদ্ধে সমস্যায় জর্জরিত শহরের মানুষের লড়াই, উল্টোটা নয়।

জাপানের সাংস্কৃতিক জীবনেও গ্রামীণ এলাকাগুলোর গুরুত্ব বজায় আছে। আঞ্চলিক খাবারদাবার, রীতি রেওয়াজ নিয়ে উৎসাহে ঘাটতি নেই। বরং এ নিয়ে নিয়মিত চর্চা হয়। শহরের বাবুরা ছুটিছাটা পেলে সাগ্রহে গ্রামদেশে ঘুরতে যান। গ্রামীণ আত্মীয়স্বজনদের সঙ্গে মোলাকাত হয়, অন্য স্বাদের এক জাপানের সঙ্গে পরিচয়ও। এই সামাজিক-সাংস্কৃতিক ঐক্য গণক্ষোভের সম্ভাবনা কমিয়ে দেয়। গ্রামের মানুষের রাগ, অভিযোগকে ভিত্তি করে জনমুখী রাজনীতির কোনও সুযোগ তৈরিই হয় না।

সর্বোপরি আছেন ‘উপেক্ষিত অভিবাসী’রা। ইউরোপ-আমেরিকায় জনমুখী রাজনীতির অন্যতম হাতিয়ার অভিবাসী-বিরোধী গণ আবেগ। কিন্তু জাপানে অভিবাসীদের সংখ্যা মোট জনসংখ্যার আড়াই শতাংশও নয়। তার ওপর অভিবাসীরা দেশীয়দের কাজের সুযোগ কেড়ে নিচ্ছে, এমন ভাবনা বিশেষ আমল পায় না। টোকিওর সোফিয়া ইউনিভার্সিটির অ্যাসোসিয়েট প্রোফেসর টিনা বুরেট মনে করিয়ে দিয়েছেন, জাপানে বেকারত্বের সমস্যা নেই। বরং জনসংখ্যা কম হওয়ায় অনেক ক্ষেত্রে শিল্পে শ্রমের জোগানে ঘাটতি আছে। সে দেশের রাজনীতিতে তাই ‘দেশীয় বনাম বহিরাগত’ অঙ্ক খাটে না।

জনমুখী রাজনীতি বিষয়টা আদতে খুবই গোলমেলে। স্থানভেদে তার চেহারা এবং চরিত্র এতটাই আলাদা যে, ধারণাটার কোনও একটা সাধারণ সংজ্ঞা খুঁজে পাওয়াই দায়। যে কথাটা মোটের ওপর খাটে, তা হল জনতা বনাম দুষ্টু সুবিধাভোগীদের একটা মেরুকরণ। তারপর রাজনৈতিক নেতারা যে এই দ্বিমুখী লড়াইয়ে জনতার পক্ষে, এমন একটা ধারণা গড়ে দেওয়ার চেষ্টা এবং জনমানসে লুকিয়ে থাকা ক্ষোভ আর আশঙ্কগুলো উস্কে দিয়ে ক্ষমতা বৃদ্ধি। জাপানের আর্থসামাজিক পরিস্থিতি থেকে শুরু করে রাজনৈতিক সংস্কৃতি, কিছুই মেরুকরণের অনুকূল নয়। সে জন্যই জনমুখী রাজনীতি করার চেষ্টা সেখানে ঠোক্কর খেতে বাধ্য।

মন নয় যে, জাপানের কোনও নেতাই কখনও জনমোহিনী রাজনীতির দিকে ঝোঁকেননি। গত শতকের শেষ দশক এবং চলতি শতকের শুরুর দশকে একাধিক নেতাকে ‘জনমুখী’ তকমা দিয়েছে দেশের সংবাদমাধ্যম। কিন্তু জাতীয় স্তরে অন্তত কোনও প্রচেষ্টাই স্থায়ী প্রভাব ফেলতে পারেনি। বরং ২০১২ সালে শিনজো আবে প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর জাতীয় রাজনীতিতে জনমুখী ধারায় দাঁড়ি পড়ে যায়। আঞ্চলিক প্রশাসনে অবশ্য জনমুখী রাজনীতি বহাল। তবে ইউরোপ-আমেরিকার তুলনায় তা একেবারেই ভিন্ন ঘরানার। মূলত গভর্নর এবং বড় বড় শহরের মেয়রদের হাত ধরে এই ধারার জনমুখী রাজনীতির টিকে থাকা। এই সব নেতারা কিছুটা 'নব্য উদারবাদী' গোত্রের। একদিকে ব্যক্তিগত ক্যারিশমা আর গণ আবেগে উস্কানির জোরে জনপ্রিয়তার শীর্ষে ওঠেন, অন্য দিকে সংস্কারের পক্ষে, ব্যবসায়িক উন্নতির পক্ষেও দাঁড়ান।

জাপানের এই নরমপন্থী জনমুখী নীতির সঙ্গেও ১৯৭০–৮০-র দশকে শ্রমিক সংগঠনগুলি ভেঙে যাওয়ার সরাসরি যোগ রয়েছে বলে মত বিশেষজ্ঞদের। মাঝে মাঝে জনমুখী রাজনীতির যে ঝলক দেখা গেছে, তা রক্ষণশীল রাজনৈতিক ব্যবস্থার বাইরে গিয়ে নয়, তার ভিতরে থেকেই। শ্রমিক সংগঠনগুলো ভেঙে যাওয়ার পর প্রতিষ্ঠান-বিরোধী রাজনীতির জন্য কোনো সমান্তরাল পরিসর তৈরিই হতে পারেনি। এলডিপি শাসনে কার্যত একদলীয় রাষ্ট্র হয়ে উঠেছে জাপান। সামাজিক অসন্তোষের সব সম্ভাবনা চাপা দেওয়া হয়েছে। নজরদারির পাল্লায় থেকেছে মিডিয়াও। নাগরিকদের অনেকে আজ সক্রিয় রাজনীতিতে আর উৎসাহী নন। নিরুপদ্রব এবং মোটের ওপর আরামদায়ক জীবনে নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছেন তাঁরা। তাই শুধু প্রাতিষ্ঠানিক বৈশিষ্ট্য নয়, জাপানের জনমানসিকতাও জনমুখী রাজনীতির প্রতিকূল।

Leave a comment

Your email address will not be published.