logo

ভাবুন কম বাঁচুন বেশি

  • August 16th, 2022
Health World

ভাবুন কম বাঁচুন বেশি

নিজস্ব প্রতিবেদন: প্রাণিজগতে মানুষ শ্রেষ্ঠ তার বোধ, বুদ্ধি, চিন্তাশীলতার কারণে, এ আমরা সবাই জানি। কিন্তু সেই চিন্তা শক্তিই যখন দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে ওঠে, অশান্ত করে তোলে জীবন? অতিরিক্ত ভাবনা অনেক সময়ে প্রায় অসুখের পর্যায়ে চলে যায়। ধরুন, এই যে অতিমারী- প্লাবিত পৃথিবী, আমরা অনেকেই তো এক বা একাধিক প্রিয়জনকে হারিয়েছি, জীবিকা হারিয়েছেন বহু পরিচিত মানুষ। এসব নিয়ে চিন্তা করতে করতে অস্থির হয়ে উঠছি, কোনও কাজে মনোনিবেশ করতে পারছি না, কোনও সমাধানসূত্র খুঁজে পাচ্ছি না, মনকে বইয়েও দিতে পারছি না অন্য কোনও স্রোতে…. খুব চেনা-চেনা লাগছে না, পরিস্থিতিটা?

এই সব সমস্যা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করে সমাধানে পৌঁছতে চেয়েছেন ম্যাঞ্চেস্টার বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক, মনোবিজ্ঞানী পিয়া ক্যালিসেন, তাঁর ‘লিভ মোর থিঙ্ক লেস’ বইটিতে। মনের ভিতর এই যে গোলোকধাঁধা, তা থেকে বেরোবার উপায় হিসেবে তিনি গবেষণালব্ধ যে বিশেষ পদ্ধতিটির কথা বলেছেন তার গালভরা নাম ‘মেটাকগনিটিভ থেরাপি’।

পেশাদার মনোবিদ হিসেবে তাঁর প্রাত্যহিক যাপনে পিয়া এমন অনেক মানুষের সংস্পর্শে আসেন যাঁদের মাথার ভিতর নানারকম কাটাছেঁড়া চলতে থাকে অহরহ। জীবনের পরবর্তী পদক্ষেপটি কী হওয়া উচিত, সঠিক সিদ্ধান্ত কোনটা, প্রার্থিত সমাধানটি খুঁজে পাবো কী ভাবে, ইত্যাদি। আমি, আপনি, তিনি… আমরা অনেকেই এ সমস্যায় ভুগেছি বা ভুগি। দ্বিধা দ্বন্দ্বগুলোকে যত বেশি গুরুত্ব দিই, ততো খেই হারিয়ে ফেলি, নতুন নতুন উপসর্গ দেখা দেয়, উদ্যমের অভাব, অনিদ্রা, মনোসংযোগের অসুবিধা, তার থেকে জন্ম নেয় আরও নতুন নতুন দুশ্চিন্তা। প্রবল মানসিক টানাপোড়েন না দেয় সুস্থির হতে, না দেয় এগোতে, মনোজগতে অচলাবস্থা তৈরি হয় একরকমের, সে পঙ্কিল আবর্তে ঘুরে ঘুরে প্রায় দুরারোগ্য উদ্বেগ ও ডিপ্রেশনের কবলে চলে যাই আমরা।

যে কোনও পরিস্থিতি অসহ্য হয়ে উঠলে মুক্তির দিশা খোঁজে মানুষ। বাজার চলতি টোটকা, আপাতদৃষ্টিতে যুক্তিসম্মত নানারকম নিরাময়-কৌশলের আশ্রয় নেয় সে। পিয়া ক্যালিসেনের মতে, অধিকাংশ ক্ষেত্রে হিতে বিপরীত হয়, ভাবনার যে আবর্ত থেকে সে মুক্তি পেতে চায়, সেই আবর্তেই আরও বেশি করে জড়িয়ে পড়ে। দুশ্চিন্তার কেন্দ্রে যে বা যা আছে, তা নিয়ে অবিরত ভেবে চললে চিন্তার উপশম হয় না, বরং বিপন্নতা বোধ বৃদ্ধি পায়। আবার নিজেকে ভাবনার কেন্দ্রে স্থাপন করলে কে আমাকে পছন্দ করলো বা করলো না, না করলে কেন করলো না, কী ভাবলো আমাকে নিয়ে ইত্যাদি চিন্তা মনকে ভারাক্রান্ত করে, আচরণের স্বতঃস্ফুর্ততা নষ্ট হয়, সহজ সামাজিক আদানপ্রদান বাধাপ্রাপ্ত হয়। নিরাপত্তাহীনতায় ভোগা মানুষ বাইরে থেকে ভরসা খোঁজে, অন্য মানুষের কাছ থেকে, বইপত্তরের কাছ থেকে, আবার জেন-এক্সের ভরসা সর্বজ্ঞ গুগলের ওপর। অধিকাংশ ক্ষেত্রে এ ভরসা বড় অলীক, বড় ক্ষণস্থায়ী, দেখতে না দেখতেই হাওয়ায় মিলিয়ে যায়।

ম্যাডাম ক্যালিসেন বলছেন, প্রতিটি কাজের পিছনে কিছু পরিকল্পনা থাকা দরকার। সে পরিকল্পনা যতক্ষণ পরিমিতিবোধ দ্বারা চালিত, ততক্ষণ তা স্বাস্থ্যকর। কখনও কখনও মানুষ প্রাত্যহিক যাপনের নগণ্য খুঁটিনাটিও নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখতে চেয়ে পরিকল্পনার দাস হয়ে ওঠে। তাসের দেশের রেপ্লিকা হয়ে ওঠে তাদের জীবন। স্ফূর্তিহীন, আনন্দবর্জিত। নিয়মের নিগড় ছিঁড়ে যখন অপ্রত্যাশিত কোনও ঘটনা ঘটে, এদের জীবনের ভর কেন্দ্রটা টলমল করে ওঠে।

কিছু না কিছু নিয়ে অবিরাম ভেবে চলা- এই বিষয়টিকে আমরা কী ভাবে দেখছি, পিয়া ক্যালিসেনের মেটাকগনিটিভ চিকিৎসার প্রেক্ষিতে তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। 'মেটাকগনিটিভ' শব্দটির অর্থই হল 'চিন্তা সম্পর্কিত চিন্তা'। চিন্তাভাবনার জাবর কাটা প্রায় অবসেশনের মতো হয়ে যাচ্ছে, চিকিৎসাপ্রার্থীরা অনেকে তা উপলব্ধি করেই মনোবিদের কাছে আসেন। এই সব মানুষকে আশার কথা শুনিয়েছেন ক্যালিসেন সাহেবা। মাত্রাতিরিক্ত চিন্তা-ভাবনা কোনও সহজাত বৈশিষ্ট্য নয়, কর্ণের কবচকুণ্ডল কিম্বা শর্মিলা ঠাকুরের টোলের মতো, যে তাকে বয়ে বেড়াতে হবে আজীবন। মেটাকগনিটিভ চিকিৎসা- পদ্ধতির উদ্ভাবক ম্যাঞ্চেস্টার বিশ্ববিদ্যালয়ের মনস্তত্ত্ববিদ আদ্রিয়ান ওয়েলস বলছেন, অবিরল দুর্ভাবনা করে যাওয়া একটা কৌশলমাত্র, যা আমরা সচেতন বা অবচেতনে অবলম্বন করি, সমস্যাদীর্ণ বাস্তবের সঙ্গে মোকাবিলা করার হাতিয়ার হিসাবে। ফলে এই অভ্যেস থেকে বেরিয়ে আসা খানিক মুশকিল হলেও, না-মুমকিন নয় মোটেও।

মেটাকগনিটিভ চিকিৎসা পদ্ধতি, যাকে ওয়েলস মজা করে 'মন্থর' বলেছেন, প্রাথমিক ভাবে চিন্তাস্রোতকে বাধাবন্ধহীন বয়ে যেতে দেয়। ২০২০-তে ওয়েলস, ক্যালিসেন এবং তাঁদের কয়েকজন সহকর্মী মিলে, ১৭৪জন অবসাদগ্রস্ত ব্যক্তিকে খুঁটিয়ে পরীক্ষা করে এই সিদ্ধান্তে আসেন যে অসুস্থতার কারণ যখন নেতিবাচক চিন্তাভাবনা, সেইসব চিন্তাভাবনা থেকে দূরত্ব বজায় রাখাই হবে সর্বোৎকৃষ্ট চিকিৎসা, যদিও প্রচলিত চিকিৎসা পদ্ধতি, যা কগনিটিভ বিহেভিওরাল থিয়োরি বা সিবিটি নামে পরিচিত, এতদিন ঠিক উল্টো কথাই বলে এসেছে। ক্যালিসেন স্বীকার করে নিয়েছেন যে বিগত ১০ বছর তিনি গতানুগতিক সিবিটি পদ্ধতির বদলে মেটাকগনিটিভ পদ্ধতিই ব্যবহার করে আসছেন মনোরোগের মোকাবিলায়।

মেটাকগনিটিভ পদ্ধতির মূল কথাটি হল, আশঙ্কা, দুশ্চিন্তা, উৎকণ্ঠার রাশ থাকে মানুষের নিজেরই হাতে। প্রথমে চিহ্নিত করতে হবে, কী বা কী কী এই নেতিবাচক আবেগ সমূহের উৎসমুখ খুলে দিচ্ছে। এটা প্রমাণিত যে মানুষের মনে প্রতিদিন কয়েক হাজার ভাবনা, স্মৃতি,অনুষঙ্গ খেলা করে। তার সিংহভাগ আমরা ভুলে মেরে দিই, বাকি থাকে হাতে- গোনা যে ক’টা, তাদের সূত্রে ভিড় করে আসে অপরাপর ভাবনারা, বিস্ফোরণ ঘটায় মাথার ভিতর। অতিমারী একদিন শেষ হবে, দূরের বন্ধুর সঙ্গে দেখা হবে, ইস্কুল চত্বর শিশুর কলকাকলিতে ভরে উঠবে, এসব ভাবনা আমাদের মনকে আলোকিত করে তোলে। অন্যদিকে, পৃথিবী যদি আর স্বাভাবিক না হয়? যদি আমি বেঁচে না থাকি করোনামুক্ত পৃথিবী দেখার জন্য? সবার হাতে কাজ, সবার পাতে ভাত যদি না থাকে সেই পৃথিবীতে? এইসব চিন্তা বিষণ্ণ করে আমাদের।

এখন ব্যাপার হচ্ছে, নেতিবাচক চিন্তা আসা অস্বাভাবিক কিছু নয়, কিন্তু প্রতিটি আশঙ্কা, প্রতিটি উৎকণ্ঠার ময়নাতদন্ত করতে গেলে হাতের বাইরে চলে যাবে চিন্তাস্রোত। বিষণ্ণতা ক্রমে অবসাদে পরিণত হবে। সুতরাং, কোন ভাবনার গভীরে যাব, কোনটা এড়িয়ে যাব, কোন ভাবনাতে বিচলিত হতে দেব না মনকে, প্রতিটি মানুষকে সচেতন ভাবে সে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

একটা সহজ উদাহরণ দিয়ে বোঝানো যাক। ধরুন, আপনি গল্পের বই পড়ছেন, মনে করুন, ডুবেই গেছেন বই-এ, এমন সময় পাশের ঘরে ল্যান্ড ফোনটা বেজে উঠলো, বাজতেই থাকলো। আপনি জানেন না কার ফোন, কী বার্তা নিয়ে এসেছে, বই ফেলে উঠতে ইচ্ছে করছে না অথচ ওই ক্রিং ক্রিং আওয়াজটাও টানছে, মনোযোগ ব্যাহত হচ্ছে, এরকম পরিস্থিতিতে জোর করে নিজের মনকে খানিক নিয়ন্ত্রণ করতে পারলে, এক সময়ে দেখবেন ওই একঘেয়ে শব্দটা আর আপনাকে বিচলিত করতে পারছে না। মেটাকগনিটিভ মানসিক চিকিৎসার পরিপ্রেক্ষিতে ফোনের ওই কর্কশ আওয়াজ হল আপনার আশঙ্কা, উৎকণ্ঠার প্রতীক, তার সমাধান যেহেতু আপনার হাতে নেই অতএব উপেক্ষাই এক এবং একমাত্র উপায়। আমরা কিন্তু রোজ নিজেদের অজান্তেই এই উপেক্ষার অস্ত্র ব্যবহার করি, যে অগুনতি ভাবনা, ধারণা, কল্পনা আজ মনকে ভারাক্রান্ত করছে, তার ক’টাই বা কালও মনে থেকে যায় ভেবে দেখবেন তো একবার!

মোদ্দা কথা হল, অতিরিক্ত উৎকন্ঠা আমাদের আবেগের ভারসাম্য নষ্ট করে দেয়, সুতরাং, দুশ্চিন্তা আমাকে নিয়ন্ত্রণ করবে সেটি কিছুতেই হতে দেওয়া যাবে না, রাশ নিজের হাতে থাকবে, চিন্তাস্রোত বইবে, যে ভাবে আমি তাকে বওয়াতে চাইব, সেই ভাবে। এই দক্ষতা আয়ত্ত করা বড় সহজ কাজ নয়। মেটাকগনিটিভ থেরাপি ছোট ছোট অভ্যাসের মাধ্যমে এই দক্ষতা আয়ত্ত করতে শেখায়। পিয়া ক্যালিসেন একটা সহজ দাওয়াই বাতলেছেন অতিরিক্ত চিন্তাপ্রবণ ব্যক্তিদের জন্য। তাঁর মতে ‘কী ভাবছি’ তার চেয়েও যে ভাবনা আমাদের বেশি অবসন্ন করে তা হল ‘জীবনের কত অমূল্য সময় এই ভাবনার পিছনে ব্যয় করলাম’! অতএব, এতোলবেতোল চিন্তার জন্য প্রতিদিন আধ ঘণ্টাটাক সময় ধার্য করুন (ঘুমের আগে আগে না হওয়াই বাঞ্ছনীয়, অনিদ্রারোগ দেখা দিতে পারে), দিনের বাকি সময়ে এইসব চিন্তারা যতই বুড়বুড়ি কাটুক মনের চারপাশে, সচেতন ভাবে তাদের তুলে রাখুন ওই বিশেষ সময়ের জন্য। এই সংযমটুকু দুশ্চিন্তাপ্রবণ ব্যক্তিকে আত্মবিশ্বাস দেবে, সে পারে, ইচ্ছে করলেই পারে হাবিজাবি ভাবনা মাথা থেকে দূর দূর করে তাড়িয়ে, জরুরি, ফলপ্রসূ বিষয়গুলোর ওপর মনঃসংযোগ করতে। এর পাশাপাশি, আরএকটি অমূল্য উপলব্ধি হয় তার, ক্যালিসেন ম্যাডামের বহু আগেই যা ধ্বনিত হয়েছে আমাদের সব মুশকিলের আসান রবি ঠাকুরের কবিতায়….

‘যাহার লাগি চক্ষু বুজে/ বহিয়ে দিলাম অশ্রুসাগর/ তাহারে বাদ দিয়েও দেখি/ বিশ্বভুবন মস্ত ডাগর।….. খুব খানিকটে কেঁদে কেটে/ অশ্রু ঢেলে ঘড়া ঘড়া/ মনের সঙ্গে এক রকমে/ করে নে ভাই, বোঝাপড়া।/….. মনেরে তাই কহ যে,/ ভালো মন্দ যাহাই আসুক/ সত্যেরে লও সহজে।’

Leave a comment

Your email address will not be published.