logo

পরস্পরের চোখে নারী-পুরুষ

  • August 16th, 2022
Man-Woman

পরস্পরের চোখে নারী-পুরুষ

পরস্পরের চোখে নারী-পুরুষ

নিজস্ব প্রতিবেদন: ঊনবিংশ শতাব্দীর শুরুর দিক। চিত্রকর জঁ অগাস্ত ডমিনিক ইনগ্রেস, ক্যানভাসের ওপর তেলরং দিয়ে প্রতিকৃতি আঁকছেন, এক তুর্কী নগ্নিকার। মডেল পেশায় হোটেলকর্মী, ময়ূরকণ্ঠি পালকের পাখা হাতে, পিছন ফিরে, আধশোয়া হয়ে আছেন সোফার ওপর, ঘাড় ঈষৎ ঘোরানো, মদালস দৃষ্টি কাঁধ পেরিয়ে ছুঁয়েছে শিল্পীর মুখ। ছবির নাম লা গ্রান্দ ওদালিস্ক। রূপ-লাস্য-বিভঙ্গ সবই ধরা পড়েছে শিল্পীর তুলিতে, তবু কী যেন নেই, কীসের যেন অভাব! জনসমক্ষে প্রদর্শিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সমালোচনার ঝড় উঠলো ছবিটিকে ঘিরে। মডেলের অতিদীর্ঘ পৃষ্ঠদেশ এবং অদ্ভুত গড়ন দর্শকদের ব্যঙ্গ-বিদ্রুপের অভিমুখ হয়ে উঠলো। এর বেশ কিছু বছর পর, ২০০৪ সালে, একদল ফরাসী চিকিৎসক ঈঙ্গিত দেন, শরীরে পাঁচটি কশেরুকা অতিরিক্ত থাকলে তবেই কারও পিঠ অমন অস্বাভাবিক লম্বা দেখাতে পারে।

উনবিংশ শতকের রোম্যান্টিক ধারার চিত্রকলায় নগ্নিকা মডেলদের ছড়াছড়ি, দর্শকের দিকে পিঠ, ক্ষীণ কটি, গুরু নিতম্ব। আধুনিক পরিভাষায় যাকে আমরা আওয়ারগ্লাস ফিগার বলি, তাকেই মনে করা হত নারীদেহ-সৌষ্ঠবের শেষ কথা। ইনগ্রেস সম্ভবত তাঁর আঁকা ছবিতে কৃশতনু ক্ষীণকটি গুরুশ্রোণী মডেলের সহজাত যৌন আবেদনটিকে অতিরঞ্জিত করে দেখাতে গিয়ে যাকে বলে ছড়িয়ে ফেলেছিলেন।

সাজগোজ পোশাকআশাকের অল্প রদবদলে নারীর চেহারা ও ব্যক্তিত্বে আকর্ষণী ক্ষমতা, আত্মবিশ্বাস ও সপ্রতিভতা এক ধাক্কায় অনেকটা বেড়ে গেছে, এমনটা হামেশাই দেখা যায়। ভার্জিনিয়ার ফ্রেডেরিক্সবার্গের মেরি ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ের মনস্তত্ত্ববিদ মিরিয়ম লিসের মতে সাজপোশাকে যৌন আবেদন নয়, বরং খানিক রক্ষণশীলতাই একজন মহিলাকে কেরিয়ারের শুরুতে কিম্বা রাজনীতিবিদ হিসেবে নির্বাচিত হওয়ার রাস্তায় অনেকখানি এগিয়ে রাখে।

এখন প্রশ্ন হল, প্রাচীন ভারতীয় কবি কালিদাস যাকে 'মধ্যেক্ষামা' এবং 'শ্রোণীভারাদলস- গমনা' বলে বর্ণনা করছেন, ঊনবিংশ শতকের ফ্রান্সও সেই একই দৈহিক বৈশিষ্ট্যসমূহকে আবেদনময় মনে করছে, অর্থাৎ সৌন্দর্যের কোনও কোনও মাপকাঠি যে স্থানকালের ঊর্ধ্বে উঠে সমাদৃত হচ্ছে, এর পিছনে কারণটা কী? বিভিন্ন বিশেষজ্ঞের মতামতকে এক জায়গায় এনে এই কারণ খোঁজার চেষ্টা করেছেন বিবিসি-র বরিষ্ঠ সাংবাদিক উইলিয়াম পার্ক।

বিবর্তনবাদী জীববিজ্ঞানীদের একাংশ মনে করেন, এই সমাদরের কারণ প্রজননের সুবিধা। তাঁদের মতে, যে ইস্ট্রোজেনের আধিক্য নারী-শরীরকে উর্বর করে, তা-ই তাকে ক্ষীণকটি গুরুনিতম্ব উপহার দেয়। জিনের কেরামতিতে সেই হরমোনের মাত্রা এবং দেহসৌষ্ঠব প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে প্রবাহিত হয়। অন্যদিকে, ইউ.কে.-র নর্থাম্ব্রিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের জীবতত্ত্ববিদ জঁ বোভে বলেছেন আওয়ারগ্লাস ফিগার বলুন, সুশ্রী মুখমণ্ডল কিম্বা চকচকে ত্বক, যা নারীকে পুরুষের চোখে আবেদনময়ী করে তোলে সবই যে কেবল যৌন হরমোনের কারসাজি তা জোর দিয়ে বলার মতো পর্যাপ্ত বৈজ্ঞানিক তথ্য এখনও আমাদের কাছে নেই।
বিভিন্ন ঐতিহাসিক কালপর্বে চিত্রকলা ও অপরাপর শিল্পকে আশ্রয় করে মঁসিয়ে বোভে নারী শরীরের আদর্শ নিরূপণ করতে সচেষ্ট হয়েছিলেন। খ্রীস্টপূর্ব ৫০০বছর থেকে পঞ্চদশ শতক, এই পর্বে আদর্শ নারীশরীরের কটি-নিতম্বের অনুপাত ছিল ০.৭৫ অর্থাৎ কোমরের আদর্শ মাপ মোটামুটি পশ্চাদ্দেশের ৭৫% হবে, এমনটাই ধরা হত। পঞ্চদশ শতক থেকে শিল্পে প্রতিবিম্বিত নারী শরীরে কটিদেশ ক্ষীণতর হতে হতে ইনগ্রেসের সময়ে তা নিতম্বের দুই-তৃতীয়াংশে দাঁড়ালো। আবার বিংশ শতাব্দীতে পৌঁছে বোভেসাহেব যখন প্লেবয় পত্রিকার মডেল এবং আন্তর্জাতিক সৌন্দর্য প্রতিযোগিতার বিজয়িনীদের ভিত্তি করে নারীশরীরের মাপজোক নিরূপণ করলেন, তখন দেখা গেল শিল্পরুচি সম্পূর্ণ বিপরীতমুখী পথে বাঁক নিয়েছে।

অর্থাৎ, আওয়ারগ্লাস ফিগার পুরুষের চোখে নারীকে আকর্ষক করে তুললেও তা যে নারীর ক্ষেত্রে জিনগত উত্তরাধিকার এবং প্রজনন-সহায়ক এমনটা জোর দিয়ে বলছেন না বোভে। এই বিশেষ ধরনের দেহসৌষ্ঠব নারীর প্রজনন-ক্ষম বয়সের পরিচায়ক বলেই তা পুরুষকে টানে, এটুকুই শুধু নিশ্চিত ভাবে বলতে পেরেছেন তিনি।

এরপর স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে যে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ এক হওয়া সত্ত্বেও মানুষ বাহ্যিক রূপে একে অপরের থেকে এতখানি আলাদা হয়ে ওঠে কীসের ভিত্তিতে! অস্ট্রেলিয়ার ব্রিসবেনের কুইন্সল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের মনস্তত্ত্ববিদ বার্নাবি ডিক্সন এবং তাঁর সহকর্মীরা একবার বিপরীত লিঙ্গের শারীরিক গঠনের কম্পিউটারজাত প্রকারভেদের মূল্যায়ন করার দায়িত্ব দিয়েছিলেন একদল বিষমকামী মানুষকে, উদ্দেশ্য ছিল এই মূল্যায়নের মাধ্যমে আদর্শ গঠনটিকে বেছে নেওয়া। মোট ২৪টি দৈহিক লক্ষণ বা বৈশিষ্ট্য খুঁজে পাওয়া গিয়েছিল যার ভিত্তিতে বিভিন্ন শারীরিক গঠনকে আলাদা করা যায়, যেমন উরুর দৈর্ঘ্য, উচ্চতা, কাঁধের প্রস্থ, কটি-নিতম্বের অনুপাত, স্তনের পরিমাপ ইত্যাদি। সবচেয়ে বেশি ভোট পেয়েছিল যে সমলিঙ্গ যুগল, তাদের যদি সন্তান হত, তবে তারা মা-বাবার কোন কোন দেহ লক্ষণের উত্তরাধিকারী হত, সাধারণ ভাবে মানুষ বিপরীত লিঙ্গের কোন কোন শারীরিক বৈশিষ্ট্য পছন্দ বা অপছন্দ করছে, এই দেহলক্ষণ, পছন্দ বা অপছন্দ প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে কতখানি এক থাকছে, কোথায় আলাদা হয়ে যাচ্ছে, এসবই ছিল গবেষণার কেন্দ্রে।

নারীর ক্ষেত্রে পুরুষের পছন্দ, প্রাথমিক ভাবে ছিল দেহের আয়তন। সে নিজের চেয়ে দুবলা-পাতলা, হাল্কা চেহারার মেয়েই পছন্দ করতো। স্তনের আকার, কটি-নিতম্বের অনুপাত ইত্যাদি বৈশিষ্ট্যগুলি পরবর্তী সময়ে ধীরে ধীরে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। অন্যদিকে,নারীর পছন্দের পুরুষ-শরীরটি কিন্তু প্রথম থেকেই প্রায় একই রকম রয়ে গিয়েছে, দীর্ঘকায়, বৃষস্কন্ধ, খেলোয়াড় বা সাঁতারুসুলভ চেহারার পুরুষের প্রতি প্রবল যৌন আকর্ষণ অনুভব করে নারী। নিয়ম থাকলে তার ব্যত্যয়ও থাকবে। অতএব কে, কখন, কোন পরিপ্রেক্ষিতে নিয়ম মানবে বা ভাঙবে তা নিয়েও পরীক্ষানিরীক্ষা করেছেন স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের জীববিদ্যার গবেষক ক্যালেডা ক্রেবস ডেন্টঁ।

ডেন্টঁ এবং ডিক্সন দু’জনের মতেই, ব্যতিক্রমীর সামনে বিছানো থাকে অযুত সম্ভাবনার দিগন্ত। নিয়মের বেড়িতে বাঁধা মানুষ অচেনাকে ভয় পায়, এড়িয়ে চলে, সেই অচেনাকেই সাদরে আলিঙ্গন করে মুক্তমণা প্রথাবিরোধী। অনন্যতা, যাকে প্রাণীবিজ্ঞানের পরিভাষায় 'পলিমরফিজম' বলা হয়, তা সন্দেহাতীত ভাবে উৎকৃষ্টতার লক্ষণ। এই অনন্যতাই যে কোনও প্রাণীকে যৌন ভাবে আকর্ষক করে তোলে। অনন্যতার পরেই মানুষ-প্রাণী নির্বিশেষে যা নারীকে টানে তা হল পুরুষের সাহস ও লড়কে লেঙ্গে মনোভাব। পুরুষের মোটা ভুরু, চওড়া চিবুক আর শ্মশ্রুগুম্ফশোভিত মুখমণ্ডল তার টেস্টোস্টেরনের আধিক্যের পরিচায়ক, তেমন পুরুষও নারীর কাম্য, কারণ টেস্টোস্টেরন শারীরিক শক্তি ও সক্ষমতা প্রদানকারী হরমোন। আবার এই বিশেষ ধাঁচটিও একসময়ে একঘেয়ে হয়ে যেতে পারে, তখন পরিষ্কার করে দাড়িগোঁফ কামানো পুরুষের দিকে ঝুঁকে পড়ে নারী, কখনও কখনও আবার উল্টোটাও ঘটে। ডিক্সন বলেন, যা নতুনরকম, যা অন্যরকম, তা বিপরীত লিঙ্গের কাছে, চির-আকর্ষণীয়। আবার ডেন্টিঁ-র মতে, এই নতুনত্ব শুধু প্রাণীজগতে নয়, সংস্কৃতির আঙিনাতেও একটা অন্য বাতাস বইয়ে দেয়। নতুনত্বের প্রতি তীব্র আকর্ষণ জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে তার চিহ্ন রেখে যায়। খুব সহজ একটা উদাহরণ হল, সদ্যোজাত শিশুর নামকরণ। একসময় যে সব নাম খুব জনপ্রিয় ছিল, সেগুলো এখন আদ্যিকালের বলে মনে হয়। হরনাথ, সুনীল, গীতা, রেখা-কে সরিয়ে যে ভাবে রাহুল, স্বপ্নিল, কুর্চি, মোহর-রা জায়গা করে নিয়েছে আধুনিক নামকরণ অভিধানে, কে বলতে পারে আরও ১০ বছর পর এদেরও জায়গা ছেড়ে দিতে হবে না, নতুনতর নামেদের জন্য?

Leave a comment

Your email address will not be published.