logo

লখনউ-এর বালকের গল্প

  • August 13th, 2022
Books, Suman Nama

লখনউ-এর বালকের গল্প

লখনউ-এর বালকের গল্প

সুমন চট্টোপাধ্যায়

‘ফর রাজন রহেজা, প্রিন্স অব প্রোপ্রাইটারস’৷

তাঁর আত্মজীবনীর প্রথম খণ্ড ‘লখনউ বয়’-এর উৎসর্গটি দেখে, সত্যি কথা বলতে কী, প্রথম চোটে বেশ খানিকটা হতাশ আর ক্রুদ্ধ হয়েছিলাম৷ তা হলে কি এত দিন লেখা পড়ে বিনোদ মেহতার (ভদ্রলোকের সঙ্গে আমার আলাপ হয়েছিল মাত্র একবার, বছর পাঁচেক আগে তাঁর পত্রিকাগোষ্ঠী আয়োজিত একটি বিতর্কসভায় যোগ দিতে তিনি যখন কলকাতায় এসেছিলেন) চরিত্র ও ব্যক্তিত্বের যে অবয়বটি মনে মনে তৈরি করেছিলাম, সেটা নেহাতই ভুল ছিল? বিনোদও কি তা হলে শেষ বিচারে আরও অজস্র চামচা-সম্পাদকদের মধ্যেই আর একজন? নইলে কোনও আত্মসম্মান জ্ঞানসম্পন্ন মানুষ নিজের জীবন-চরিত অন্নদাতা-ব্যবসায়ীকে উৎসর্গ করে? কেন স্ত্রী ছিলেন না? হারিয়ে যাওয়া কন্যা ছিল না? কিংবা ছিলেন না এমন কোনও সুহৃদ অথবা শুভানুধ্যায়ী যাঁর ঋণ তিনি এই সুযোগে সাদা কালো হরফে স্বীকার করে যেতে পারতেন?

মালিক সম্পর্কে বিনোদের আহ্লাদে আটখানা হওয়ার একটি জব্বর অজুহাত অবশ্যই ছিল৷ রাহেজাদের মালিকানাধীন পত্রিকায় ১৯৯৫ থেকে ২০১৫, এই কুড়িটি বছর দিব্যি নিশ্চিন্তে কাটিয়ে দিতে পেরেছিলেন বিনোদ৷ সেই বিনোদ মেহতা যিনি তার আগের তিনটি বছরে তিনটি ভিন্ন জায়গায় সম্পাদকের চাকরিটি খুইয়ে ‘এডিটর হু হ্যাজ লস্ট দ্য মোস্ট জবস’-এর তালকিায় গিনেস বুক অব রেকর্ডে নিজের নামটি তোলার কথা ভাবছিলেন৷ ২০১০ সালের অক্টোবরে আউটলুকের পঞ্চদশ- বর্ষপূর্তিতে নিজের এই বিস্ময়কর, যতি-হীন যাত্রাপথের কাহিনী লিখতে গিয়ে বিনোদ নিজেই তাই লিখেছিলেন, ‘অ্যান্ড ওয়ান্ডার অব ওয়ান্ডারস, ওয়েল-উইশারস অ্যান্ড এনিমিজ হ্যাভ স্টপড আসকিং মি হোয়েন আই উইল কুইট৷ নাও দে আস্ক, হোয়েন আই উইল রিটায়ার!’
পত্রিকা সম্পাদনার চাকরি থেকে বিনোদ কিছু কাল হল অবসর নিয়েছিলেন৷ কিন্ত্ত নিজের কলমটাকে অবসরে পাঠাননি৷ বরং নিজের কুছ-পরোয়া-নেই মেজাজটাকে টগবগে রেখে শেষ করে গিয়েছেন তাঁর আত্মজীবনীর ‘সিকোয়েল’-টিও৷ সেখানে আর তিনি বাদশাহি লখনউ-র বালকটি নন, পুরোদস্ত্তর ‘এডিটর’৷ মিডিয়া, শিল্পপতি আর নেতাদের সঙ্গে তাঁর ওঠা-বসা, ঘাত-প্রতিঘাতের এক অনাবিল, উজ্জ্বল আলেখ্য (বইটির শিরোনাম, ‘এডিটর আনপ্লাগড, মিডিয়া,ম্যাগনেটস,নেতাজ অ্যান্ড মি’)৷ তারপর ঠিক যে ভাবে হঠাৎ একদিন তড়িঘড়ি করে অফিসে নিজের ঘরে ঢুকে কাগজ-পত্র আর টুকিটাকি জিনিসপত্র গুছিয়ে তিনি সহকর্মীদের গুড-বাই বলে চাকরি ছেড়ে চলে যেতেন, প্রায় সেই ভাবেই যেন কথা-নেই-বার্তা-নেই নিজের জীবনের নটে গাছটিকেও বিনোদ মুড়িয়ে দিয়ে চলে গেলেন একই রকম চকিতে৷ বিনোদ মেহতা এ বার চাকরি-প্রার্থী সবচেয়ে ওপরওয়ালার৷

জানি না কেন, ভিভিয়ান রিচার্ডসের মতো মাঠের চারদিকে ব্যাট হাঁকিয়ে যাঁরা নিজের জীবনের ইনিংস খেলতে পছন্দ করেন, তাঁদের অনেকেরই ইতিহাসের কাছে শেষমেশ প্রত্যাশা থাকে যৎসামান্যই৷ অনেক বছর আগে অক্সফোর্ডের লাথবেরি রোডে তাঁর টিপটপ বৈঠক-খানায় বসে একবার নীরদ চন্দ্র চৌধুরী মহাশয়ের সঙ্গে দীর্ঘ আলাপ-চারিতার সৌভাগ্য হয়েছিল আমার৷ বচনবাগীশ, উদ্ধত, সমকালীন পৃথিবীর যাবতীয় সব কীর্তিকে আবর্জনার অতিরিক্ত কিছু জ্ঞান না করা এই অহংকারী বৃদ্ধ গোটা সাক্ষাৎকারে মাথা নুইয়ে, গলা প্রায় সরগমের নীচের ‘সা’-তে নামিয়ে এনে জবাব দিয়েছিলেন মাত্র একবার, যখন জানতে চেয়েছিলাম ভবিষ্যৎ প্রজন্ম কীভাবে তাঁকে মনে রাখলে তিনি খুশি হবেন৷ ‘কী ভাবে আবার, চাইলে এন্টারটেইনার হিসেবে মনে রাখতে পারে৷’ মক্ষমুলার সাহেবের জীবনীকার, ‘দাই হ্যান্ড গ্রেট অ্যানার্ক’-এর রচয়িতা, ‘আত্মঘাতী বাঙালি’-কে সতত উচ্চগ্রামে ধিক্কার জানানো ‘আননোন ইন্ডিয়ান’-এর শেষ প্রত্যাশা ছিল এমনই যৎসামান্য৷ 

বিনোদ মেহতার প্রত্যাশা তার চেয়েও কম৷ ‘লখনউ বয়’-এর মুখবন্ধে অকপটে বিনোদ লিখে গিয়েছেন, ইতিহাস তাঁকে ‘ফুটনোট’ হিসেবে মনে রাখবে কি না সে ব্যাপারে তিনি নিশ্চিত নন৷ ‘কিন্ত্ত আমি চলে যাওয়ার পরে আমার বন্ধু-বান্ধব ও ভক্তকূল যদি এ কথা বলে ‘হি ওয়াজ এ ডিসেন্ট ফেলো’,আমি যে যৎপরোনাস্তি সন্ত্তষ্ট হব তাতে কোনও সন্দেহ নেই৷’ বিনোদের দাবি, সব কিছুর ঊর্ধ্বে সারাটা জীবন ধরে তিনি একটাই উচ্চাশা পোষণ করে এসেছেন এবং তা পূরণ করার জন্য যথাসাধ্য ক্লেশও বহন করেছেন৷ ‘টু বি এ ডিসেন্ট হিউম্যান বিয়িং৷’

কিন্ত্ত কাকে বলে এমন ‘ডিসেন্ট হিউম্যান বিয়িং’? বাংলায় ‘ডিসেন্ট’ শব্দটির যথার্থ প্রতিশব্দ হয় কি না জানা নেই৷ ইংরেজি অভিধানে এর যা সংজ্ঞা আছে, বিনোদের মনে হয়েছে, ‘দ্যাট ইজ প্লেবিয়ান ইভন ফর মাই টেস্ট’৷ অতএব নিজের চরিত্রের সংজ্ঞা নিরূপনে শেক্সপীয়ারের হ্যামলেটে পোলোনিয়াসের সেই বহু-চর্চিত পিতৃ-উপদেশের শরণাপন্ন হয়েছেন তিনি৷ ‘This above all- to thine own self be true/And it must follow, as the night the day/ Thou canst not then be false to any man.’ 
বলাটা যতটা সহজ করাটা বোধহয় ততটাই কঠিন৷ অথচ তাঁর আত্মজীবনীর দু’টি খণ্ডে বিনোদ এই কঠিন কাজটাই করতে পেরেছেন অক্লেশে, কে কী ভাবল বা ভাবতে পারে এমনতরো ছা-পোষা, মধ্যবিত্ত-সুলভ দুশ্চিন্তাকে ধর্তব্যের মধ্যে না এনে৷ ফলে নিজের জীবন-কাহিনী লিখতে বসে ওরওয়েল-ভক্ত বিনোদ সার কথা হিসেবে শিরোধার্য করেছেন এই নিদানকে যে ‘অ্যান অটোবায়োগ্রাফি ইজ ওনলি টু বি ট্রাস্টেড হোয়েন ইট রিভিলস সামথিং ডিসগ্রেসফুল৷’ এমন কোনও মানুষ নেই যাঁর ব্যক্তি-জীবনে ‘সামথিং ডিসগ্রেসফুল’ ঘটেনি বা ঘটতে পারে না৷ দেব-দেবীর জীবনেই ঘটে, মনুষ্য তো কোন ছার৷ কিন্ত্ত ভারতীয় আত্মজীবনী রচনার স্বীকৃত এবং চলতি ঘরানাটাই হল যেন তেন প্রকারেণ জীবনের এই ‘সামথিং ডিসগ্রেসফুল’ পর্বগুলিকেই অস্বীকার করে নিজের অপাপবিদ্ধ, অর্ধসত্য ও খণ্ডিত সত্ত্বাকেই পাঠকের সামনে হাজির করা৷ সচেতনভাবেই এমনতরো আটপৌরে আত্মপ্রবঞ্চনার রাস্তায় হাঁটেননি বিনোদ৷ কোনও রকম ঢাক-ঢাক গুড় গুড় না করে নিজেকে নিজেই তিনি বে-আব্রু করে দিয়েছেন হাসতে হাসতে৷ লখনউয়ের বালকটির কাহিনী সেই কারণে শুধু আর সুখপাঠ্য হয়ে থেমে থাকেনি, হয়েছে বিশ্বাসযোগ্য৷ 

প্রায় চার দশকের সাংবাদিক জীবনে (তিনি অবশ্য বাকি আর পাঁচজনের মতো সিঁড়ির শেষ ধাপ থেকে শুরু করে সম্পাদকের ঘরে পৌঁছননি৷ শুরু থেকে শেষ বরাবরই তিনি সম্পাদক থেকেছেন৷ এই অর্থে তিনি ক্ষণজন্মা কেননা কর্মচারী-সাংবাদিকের জীবনে এমন দৃষ্টান্ত এদেশে বোধহয় আর একটিও নেই)

Leave a comment

Your email address will not be published.