logo

একদা আমি পুতিনের সমর্থক ছিলাম…

  • August 16th, 2022
News

একদা আমি পুতিনের সমর্থক ছিলাম…

আনাশতাশিয়া কেরিয়ার

অনুবাদ- সুমন চট্টোপাধ্যায়

কী করে আমাদের আলোচনা রাজনীতির দিকে বাঁক নিল, আমার ঠিক মনে নেই। কেন না গত কয়েক মাস যাবৎ আমার রুশি বাপ-মায়ের সঙ্গে কথা বলার সময় আমি খুব সতর্ক থাকি, অনেক ভেবে-চিন্তে কথা বলি, নিষিদ্ধ বিষয়ে পারতপক্ষে মুখই খুলি না। সুতরাং সেদিন যে কথায় কথায় রাজনীতির ভিতরে ঢুকে পড়লাম, সেটি অপরিকল্পিত সিদ্ধান্ত, মুহূর্তের পদস্খলন। সেটা ২০১৮ সালের কথা, আমি তখন ওয়েস্ট ভার্জিনিয়ার একটি ছোট কলেজ শহরে একটি ছোট্ট ঘরে ঠাঁই নিয়েছি। রাশিয়া থেকে আসা ইস্তক আমি সেই শহরেরই বাসিন্দা। ফেস টাইম কলের ওপারে আমার মা, তাঁর মুখটা থমথমে। সপ্তাহে একদিন এই ভাবে কুশল বিনিময় করা, পরস্পরের খোঁজ খবর নেওয়া তখন আমাদের অভ্যাসে পরিণত হয়ে গিয়েছে। আমি পুতিনের সমালোচনা করছিলাম তখন…।

এমন নয় যে আমি পুতিনকে গালমন্দ করেছি। আমার মুখ ফসকে বেরিয়ে গিয়েছে, 'যাই বলো, তাই বলো, পুতিনের ক্ষমতায় থাকাটা রাশিয়ার পক্ষে মঙ্গলজনক নয়। দেশপ্রেমের মানে এই নয় আমি দেশের খারাপ দিকগুলোকে সচেতন ভাবে অবজ্ঞা করব এই আশায় যে একদিন না একদিন সেগুলোর নিরাময় হয়ে যাবে আপনা থেকেই। যার জন্য এসব হচ্ছে তার দিক থেকেও আমরা নজর ঘুরিয়ে রাখতে পারি না।' হঠাৎ দেখি মা ক্যামেরা থেকে মুখটা সরিয়ে নিলেন, স্পষ্ট বুঝলাম তাঁর দু’চোখে জল।

তারপর কয়েকটি মুহূর্ত আমরা দু’জনেই স্পিকটি নট। প্রসঙ্গান্তরে চলে যেতে এটুকু সময় তো লাগবেই। পরে ভাবতে শুরু করলাম, মামুলি রাজনৈতিক প্রশ্নে আমাদের মতান্তর মা’কে কাঁদিয়ে তুলল কেন? আমি দেশ ছাড়ার পরে আমাদের পরিবার কি এই ভাবে ‘প্রোপাগান্ডায়’ অন্ধ-বিশ্বাসী হয়ে উঠল? যে বাবা-মাকে আমি ছেড়ে এসেছিলাম এমন নাটকীয় রূপান্তর হয়ে গেল তাঁদের?

আমার বাপ-মায়ের মতো আমিও একদা পুতিনপন্থী ছিলাম। আমি আন্তরিক ভাবেই তখন বিশ্বাস করতাম নব্য-নাৎসিদের হাত থেকে নিয়ন্ত্রণ ছিনিয়ে নিতে ক্রিমিয়া দখল করে পুতিন ঠিক কাজ করেছেন। বিশ্বাস করতাম, রাশিয়া ঘোরতর অবিচার অপপ্রচারের শিকার কেন না রাশিয়া একটি মস্ত বড় দেশ, প্রচুর পরিমাণ তেলের মালিক। তারপর একদিন আমি দ্বিতীয় স্নাতক ডিগ্রির জন্য আমেরিকায় চলে এলাম, প্রেমে পড়ে গেলাম সাংবাদিকতার। ধীরে ধীরে আমার উপলব্ধি হলো, পুরোনো বিশ্বাসগুলি সত্য বা তথ্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত ছিল না। বুঝলাম ক্রেমলিনের সর্বগ্রাসী প্রোপাগান্ডা মেশিন আমাকেও বিপথে চালিত করেছিল।

আমার পরিবার থাকে রাশিয়ায়, বাবা-মা দু’জনেই উচ্চশিক্ষিত, উদারমনস্ক মানুষ। অথচ এখন আমি তাঁদের চিনতেই পারি না, মনে হয় দু’জনেই ভিন গ্রহের মানুষ। আরও অসংখ্য রুশির মতো তাঁদেরও স্থির বিশ্বাস নব্য নাৎসিদের উৎখাত করতেই পুতিন ইউক্রেন আক্রমণ করেছেন।

ফেস টাইমে মায়ের সঙ্গে আমার ওই আলোচনার পরে আমি বাবা-মা দু’জনের সঙ্গেই বিষয়টি নিয়ে বিস্তারিত আলাপ আলোচনা করেছি। এখন যতবার কথা হয়, মা নয়, আমিই কষ্ট পাই। ওঁদের সঙ্গে এই বিষয়ে আলোচনা কখনও সহজ ছিল না। এখন ইউক্রেনের যুদ্ধ শুরু হওয়ার পরে আমি কথা বলতে গিয়ে অসুস্থ বোধ করি। ক্রেমলিনের মিথ্যা প্রচারে ভেসে যাওয়ার একটা মূল্য আছে যা রক্তে ভেজা।

আমি এখনও আশা করি আমাদের মতো প্রোপাগান্ডার সহজ শিকার পরিবারগুলি ধীরে ধীরে চোখের ঠুলি সরিয়ে পুতিনের স্বরূপ বুঝতে পারবে, তাঁদের সমর্থনও উবে যাবে। আর কিছু না পারি আমরা আমাদের ভালোবাসার মানুষগুলোকে এটুকু বোঝাতে পারি, এই রক্তপাত অহেতুক, অবাঞ্ছিত। আমি এখনও আমার বাবা-মাকে বোঝানোর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি, আশা ছাড়িনি। হতে পারে আমরা এখন দুই মহাদেশের অধিবাসী কিন্তু যে বিষয়টি আমাদের মধ্যে সত্যিকার দূরত্ব তৈরি করে দিচ্ছে তার নাম রাজনীতি।

পুতিন তখন যুবক, সম্ভাবনার প্রতীক। আমার প্রজন্মের আরও অসংখ্য ছেলে মেয়ের মতো রাজনীতিতে আমার রুচি ছিল না। জীবনের অনেকটা সময় জুড়ে নিজেকে অ-রাজনৈতিক ভাবতেই ভালোবেসেছি। আমি বড় হয়েছি ইওস্কর-ওলা নামের একটি অখ্যাত জনপদে, রাশিয়ার সবচেয়ে অনুন্নত এলাকার একটিতে। আর আমি শিক্ষকের সন্তান।

আমার ঠাকুমা আমাদের সঙ্গে থাকতেন। তাঁর কথা শুনে মনে হতো সোভিয়েত ইউনিয়ন চলে যাওয়া যেন স্বর্গ হতে বিদায়ের সমতুল। আদর্শগত ভাবে তিনি ছিলেন ঐক্যের সোচ্চার সমর্থক যেখানে জার্মান ভাষা শিক্ষার অধ্যাপক হিসেবে তিনি নিশ্চিত ভাবে একটি স্থায়ী ও নিরাপদ চাকরি পেতেন। সাবেক সোভিয়েত জমানার জনপ্রিয় গানগুলি তিনি আমাকে শিখিয়ে ছিলেন, প্রায়শই বলতেন মানুষ নাকি তখন অনেক বেশি সহৃদয় ছিল। আমি ভাবি সত্যিই যদি তাই হয়ে থাকে তাহলে তার কারণ কী? এমন তো নয় তাঁদের হক কেউ যখন তখন কেড়ে নিতে পারেন সেই দুর্ভাবনা সর্বক্ষণ তাঁদের তাড়া করে বেড়াত!

রাশিয়ার আকাশে পুতিন নামের এক উজ্জ্বল তারকার উত্থান দেখে আমার ঠাকুমা তো আনন্দে একেবারে ডগমগ! ১৯৯৯ সালে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট বরিস ইয়েলৎসিন তাঁকে দেশের প্রধানমন্ত্রী পদে মনোনীত করেন। তার অব্যবহিত পরে একটি ভয়ঙ্কর ঘটনা ঘটে, পরের পর অ্যাপার্টমেন্ড বিল্ডিংয়ে আকস্মিক সিরিয়াল বোমা বিস্ফোরণের ঘটনা। ৩০০ জনের মৃত্যু হয়, আহত হন আরও অনেক বেশি। পুতিন যে অবিশ্বাস্য দ্রুততায় এই ঘটনার মোকাবিলা করেন এবং সন্ত্রাসের জবাব দেন, সেই মুহূর্তটাই ছিল তাঁর পরবর্তী উল্কা-সদৃশ উত্থানের সূচনা বিন্দু। পুতিন কাঠগড়ায় তোলেন চেচেনদের, সেটাই তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণার বৈধ কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

অনেক পরে আমি জানতে পারি ঐতিহাসিক ও সংবাদিকদের একাংশ ওই ঘটনার পিছনে চেচেনদের নয়, ফেডারেল সিকিউরিটি ফোর্সের হাতযশের প্রমাণ পেয়েছিলেন। তাঁদের তত্ত্বটি ছিল, এফএসবি-র ডিরেক্টর ভ্লাদিমির পুতিন যাতে সহজে নির্বাচিত হতে পারেন, তার পথ প্রশস্ত করা। কিন্তু তার অনেক আগে আমার শৈশবে পুতিনকে যৌবন আর উজ্জ্বল ভবিষ্যতের প্রতীক বলে মনে হতো। ২০০০ সালের নির্বাচনে ঠাকুমা আমাকে সঙ্গে করে নিয়ে গিয়েছিলেন পুতিনকে ভোট দেওয়ার জন্য। উত্তেজিত হয়ে তিনি আমাকে ওপরে তুলে ধরে দেখিয়ে দেন ঠিক কোন জায়গায় ছাপ দিতে হবে।

সময় গেলে পুতিনকে কেন্দ্র করে উচ্ছ্বাস ক্রমশ স্তিমিত হতে শুরু করে। আমরা আশা করেছিলাম, তাঁর জমানায় আমাদের হাল ফিরবে। কিন্তু যখন বোঝা গেল তা আর হওয়ার নয়, আশা করাটাই ক্লান্তিকর বিষয় হয়ে দাঁড়াল। রাস্তাঘাটের অবস্থা তথৈবচ, পুলিশ আর সরকারি কর্মচারী একই রকম দুর্নীতিগ্রস্ত, মাইনে যেমন নামমাত্র ছিল তাই রইল, করের বোঝায় কোনও তারতম্য হলো না। তখন এ কথা আমার মনেই আসেনি, অন্য দেশ হলে পরের নির্বাচনে লোকে নিশ্চিত ভাবে দাবার বোর্ড উল্টে দিত অন্য কাউকে নির্বাচিত করে। মাথায় না আসার একটি কারণ হতে পারে, টেলিভিশনের পর্দায় আমরা পুতিনের প্রতিপক্ষ হিসেবে এমন সব নাম দেখতাম যাঁরা চরম অপদার্থ বা বিশিষ্ট ভাঁড়। আমি স্থির করলাম রাজনীতি নিয়ে আর মাথাই ঘামাব না। (চলবে)

Leave a comment

Your email address will not be published.