logo

হে ক্ষণিকের অতিথি

  • August 13th, 2022
News

হে ক্ষণিকের অতিথি

হে ক্ষণিকের অতিথি

সুমন চট্টোপাধ্যায়

In the middle of winter I at last discovered there was in me an invincible summer— Albert Camus

কোনটা বেশি ক্ষণস্থায়ী?

কলকাতার শীত না সুন্দরী পরস্ত্রীর এক পলকের ঈষৎ প্রশ্রয় মাখা চাহনি?

বলা মুশকিল।

এই মুহূর্তে বলতে পারি আমি যারপরনাই বিরক্ত। না বলে কয়ে ক্ষণিকের অতিথি অদৃশ্য হয়ে যাওয়ায়।

আমার বিছানার ঠিক পিছনটা পূব দিক। সকাল একটু গড়াতে শুরু করলেই খোলা জানালা দিয়ে ঝলমলে রোদ্দুর ঢুকে পড়ে আলোর তীব্র ঝলকানি নিয়ে। তিন দিন আগেও সেই রোদ্দুরে পিঠ দিয়ে বসে আমি পড়াশুনো করতাম, শরীরটা অতি প্রয়োজনীয় ভিটামিন ডি সংগ্রহ করত। আমি গত কয়েক মাস যাবৎ গৃহে অন্তরীন, সকালের ওই উপভোগ্য রোদ্দুরটুকুই ছিল প্রকৃতির সঙ্গে ভাব-ভালোবাসা করার একমাত্র উপায়। ঘুম থেকে উঠে রোদ্দুরের জন্য অপেক্ষা ছিল আমার বড় প্রিয় কাজ। দিন তিনেক আগে হঠাৎ অনুভব করলাম, রোদ্দুরে আর সেই আমেজ নেই, পিঠটা পুড়ে যাচ্ছে, যেন বোশেখ মাস। রোদ উঠলেই পর্দা টেনে দিতে হচ্ছে তাপের হাত থেকে বাঁচতে। বাড়ির ভিতরটাও গরম, দিনের বেলায় পাখা না চালালে আরাম হয় না। ফি-সন্ধেয় আমি একটু হাঁটাহাঁটি করি, কাল দরদর করে ঘামতে শুরু করলাম। তাহলে কি শীত মাত্র কয়েক ঘণ্টা ট্রানজিট ক্যাম্পে কাটিয়ে গুডবাই বলে চলেই গেল? এতই যদি চলে যাওয়ার তাড়া তাহলে আশা জাগিয়ে আসাই বা কেন? কলকাতা থেকে কত কিছুই তো দেশান্তরী হয়েছে, হচ্ছে, হবেও। সেই দলে শীত তার নাম লেখায় না কেন? বড্ড রাগ হচ্ছে আমার, নিজেকে প্রতারিত মনে হচ্ছে।

আশৈশব শীত আমার প্রিয়তম ঋতু। এক্কেবারে ছেলেবলায় কৃষ্ণনগরে থাকার সময় শীতের সকালে রোজ মাটির কলসি মাথায় নিয়ে খেজুরের রস-ওয়ালা বাড়িতে আসত। কনকনে ঠান্ডা, স্বর্গীয় স্বাদ, গলা বেয়ে নামতো যেন অমৃত-ধারা। আসত খেজুরের গুড়, পাটালি। মা পরমান্ন তৈরি করত, আমি সসপ্যানের কোণায় কোণায় লেগে থাকা চাঁছিও বেহদ্দ লোভীর মতো চেটেপুটে সাফ করতাম। ‘ম’ কারান্ত অনেক কিছুতেই আমার দুর্বলতা, মিষ্টির প্রতি সবচেয়ে বেশি। এখনও, ডায়াবেটিসকে কাঁচকলা দেখিয়ে আমি কড়া পাকের নলেন গুড়ের সন্দেশ এক ডজন বেমালুম হজম করতে পারি। মাঝরাত্তিরে ঘুম ভেঙে গেলে নিঃশব্দে রেফ্রিজারেটর খুলে রসগোল্লা অথবা যে কোনও মিষ্টির তালাশ নেওয়া আমার অবশ্যকর্তব্য। মিষ্টির সেরা সিজনও এই শীতকালই। বাবা সরকারি কলেজে অধ্যাপনা করতেন, বদলির চাকরি, ক্লাস থ্রিতে ওঠার মুখে কেষ্টনগর ছেড়ে আমরা গেলাম ঝাড়গ্রামে, তারপর টানা ছ’বছর আমার সেই অতি মনোরম মহকুমা শহরে কেটেছে। কৃষ্ণনগরে বাড়ির অদূরে ছিল জলঙ্গী নদী, ঝাড়গ্রামে নেই। সেই অভাব পূর্ণ করত, বাবার মতে, ছয় ঋতুর প্রত্যেকটির স্বতন্ত্র উপস্থিতি। গ্রীষ্ম, বর্ষা, শরৎ, হেমন্ত, শীত, বসন্ত যে যার ডালি সাজিয়ে ঠিক সময়ে জানান দিতো, আমি এসে গিয়েছি। তৎকালীন বিহার, অধুনা ঝাড়খণ্ডের লাগোয়া এই অরণ্যে ঘেরা জনপদে গরম আর ঠান্ডার যেন প্রতিযোগিতা চলত, এ বলে আমায় দ্যাখ, ও বলে আমায়। গরমে হাঁসফাঁস, শীতে ঠকঠকানি। বছর বছর লেপের তুলো ধুনে লাল শালু দিয়ে মুড়ে ফের নতুন করে সেলাই করা হত। প্রথম কয়দিন লেপটাকে ফুলো ফুলো লাগত, কিছুদিন পরেই চ্যাপ্টা রুটি। অজস্র শাল গাছ ছিল, শীত শুরু হতেই তাদের পাতা ঝরার পালা। সাঁওতাল রমণীরা দল বেঁধে এসে মাটিতে পড়ে থাকা সেই পাতা পরম যত্নে সংগ্রহ করত থালা-বাটি বানিয়ে পরে বাজারে বিক্রি করবে বলে। সন্ধ্যা নামার মুখে রাস্তায় কিছু দূর অন্তর অন্তর শালপাতার স্তূপ তৈরি করে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হত। গরিব-গুর্বো সেই আগুনে তাত নিত, দারুণ অগ্নিবাণ আমার কিশোর মনকে দোলা দিয়ে যেত অজনা আনন্দের। অর্ধশতাব্দী পরে এখনও শীত এলে আমার চোখের সামনে সেই দৃশ্য ভাসতে থাকে, মন বলে ওঠে, ‘দাও ফিরে সে অরণ্য, লও এ নগর।’

১৯৭১-এর পয়লা জানুয়ারি আমাদের কলকাতায় আসা, দিন কতক আগে সেই পদার্পণের পঞ্চাশ বছর পূর্ণ হয়ে গেল।কলকাতার শীতে গোড়ার দিকে আমার পছন্দের তালিকায় যুক্ত হয়েছিল জয়নগরের মোয়া যেটা তখন বাংলার মফঃস্বল শহরে পাওয়া যেত না। কিন্তু কলকাতার শীতকে আমি কোনও দিন আপন করে তুলতে পারলাম না, ফি-বছর সামান্য উত্তুরে হওয়া সঙ্গে নিয়ে সে আসে বটে, আলাপ-পর্ব জমে ওঠার আগেই চড়ুই পাখির মতো ফুরুৎ করে পালিয়ে যায়। এক্কেবারে এসেছিলে তবু আসে নাই জানায়ে গেলে। কলকাতার শীত কলকাত্তাইয়াদের চেয়েও বেশি আকৃষ্ট করে বাইরের মানুষকে। এক সময় শীত এলেই তাঁবু নিয়ে সার্কাস পার্টি চলে আসত পার্ক সার্কাস ময়দানে। বসত গড়ত টানা কয়েক মাস। ওয়েলিংটন স্কোয়ারের ফুটপাথে সার দিয়ে ভুটিয়ারা দোকান খুলে সোয়েটার বিক্রি করত। মস্ত বড় পুটুলি শক্ত করে বেঁধে পিঠের ওপর ফেলে বাড়ি-বাড়ি গিয়ে কাশ্মীরি শালওয়ালা মিষ্টি হিন্দিতে দরদাম চালাতো অনেকক্ষণ ধরে। দুপুরে ময়দানে গেলে মানুষের থিকথিকে ভিড়ের মধ্যে সবচেয়ে লম্বা দেখাত যাদের তারা কাবুলিওয়ালা। অসংখ্য পরিযায়ী পাখি এসে গাছে বসত সাঁতরাগাছির ঝিল-পাড়ে, ঢাকুরিয়া লেকের স্নিগ্ধ ছায়ায়। সবার শেষে গোটা ময়দান জুড়ে হত বইমেলা, সৃজনশীল বাঙালির শ্রেষ্ঠ বাৎসরিক উৎসব।

এদের মধ্যে কারা এখনও আসে কিংবা আসে না সেই গুনতির মধ্যে প্রবেশ নিষ্প্রয়োজন। কলকাতায় শীত পড়লে যারা আসবেই আসবে তারা অনাবাসী বাঙালিকূল। যে যেখানেই থাকুক পুজোর সময় বাড়ি ফেরাটা দস্তুর ছিল আমাদের ছেলেবেলায়। কলকাতায় আসার পরে দেখলাম পুজো নয় শীত। বিদেশে, বিশেষ করে ইউরোপ-আমেরিকায় শীতের লম্বা ছুটি থাকে কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে। বিমান বোঝাই হয়ে আমাদের ছেলেমেয়েরা তখন কলকাতায় নামে। বৃদ্ধ বাবা-মা’র সঙ্গে কয়েকটি দিন কাটাতে আসেন বিদেশে কর্মব্যস্ত বাবু-বিবিগণ, তাদের সঙ্গে থাকে স্যুটকেশ বোঝাই গিফট আর হরেকরকম্বা চকোলেট, আত্মীয় পরিজনের মধ্যে বিলানোর জন্য। শীতের মতো এই অনাবাসী বঙ্গসন্তানেরাও ক্ষণিকেরই অতিথি।

কলকাতার শীত আসলে মস্ত ছলনা, ওই সুন্দরী পরস্ত্রীর বাঁকা চোখে এক পলক তাকানোর মতোই। এখানে ফাস্ট-ট্র্যাক নির্দিষ্ট করে দেওয়া আছে শীতের জন্য, বাকিটা ভ্যাপসা গরমের লম্বা লাইন।

Leave a comment

Your email address will not be published.