logo

লঙ্কাকাণ্ড চলছে, চলবে

  • August 16th, 2022
News

লঙ্কাকাণ্ড চলছে, চলবে

সুমন চট্টোপাধ্যায়

গোতাবায়া রাজাপক্ষ প্রাণ বাঁচাতে দেশ থেকে ভাগলবা হওয়ার পরে দ্বীপভূমিতে জনরোষ বেশ কিছুটা স্তিমিত হয়ে এসেছিল। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী রনিল বিক্রমসিংহ নতুন প্রেসিডেন্ট পদে নির্বাচিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে শ্রীলঙ্কাবাসী ফের রাস্তায় নামতে শুরু করে দিয়েছেন। তাঁদের মনে হচ্ছে তাঁরা প্রতারিত। কেন?

বিক্রমসিংহ হাফ ডজনবার শ্রীলঙ্কার প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন। সে দেশের মানুষের চোখে তিনি রাজাপক্ষ পরিবারের শিখণ্ডি ছাড়া আর কিছুই নন। জনতার ভোটে নয়, প্রেসিডেন্ট পদে তাঁর উত্তরণ হলো সাংসদদের ভোটে, যেখানে রাজাপক্ষর দলের লোকেরাই সংখ্যাগরিষ্ঠ। তাঁরাই একজোট হয়ে বিক্রমসিংহকে জিতিয়ে দিয়েছেন। বকলমে তার মানে শ্রীলঙ্কায় রাজাপক্ষদের দখলদারই বহাল রইল। বিক্রমসিংহর পিছনে জনতার রায় নেই, রাজাপক্ষর সমর্থেনই তিনি উদ্ভাসিত। কিছুদিন আগেই ক্ষিপ্ত জনতা যখন রাষ্ট্রপতি ভবন আক্রমণ করে সেখানে ধর্নায় বসে গিয়েছিল, তখন বিক্রমসিংহর বাড়িও তাদের রোষানল থেকে বাদ পড়েনি। আগুনে ভস্মীভূত হয়ে যায় প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন। এর অর্থ গোতাবায়া মুদ্রার এপিঠ হলে বিক্রমসিংহ উল্টো পিঠ।

শ্রীলঙ্কার সংবিধান অনুসারে দেশের প্রেসিডেন্টকে সরাসরি জনগণের ভোট নির্বাচিত হতে হয়। কোনও আকস্মিক কারণে প্রেসিডেন্ট তাঁর কার্যকালের পুরো মেয়াদ সম্পূর্ণ করতে না পারলে সংসদ তখন আপতকালীন ব্যবস্থা হিসেবে নতুন প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত করে। স্বাধীন শ্রীলঙ্কার ইতিহাসে এর আগে মাত্র একবারই এমন অপ্রত্যাশিত ঘটনা ঘটেছিল। প্রেসিডেন্ট প্রেমদাস আততায়ীর গুলিতে নিহত হওয়ার পরে নতুন প্রেসিডেন্ট নির্বাচন করে সংসদ। তারপর এই দ্বিতীয়বার সেই ব্যতিক্রমী ঘটনার পুনরাবৃত্তি হল। রাজাপক্ষর মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা ২০২৪ সালে, ততদিন পর্যন্ত বিক্রমসিংহেরও প্রেসিডেন্ট পদে আসীন থাকার কথা। যদি না জনরোষের কারণে তাঁকে রাজাপক্ষর পদাঙ্ক অনুসরণ করতে হয়।

বর্তমান পরিস্থিতিতে বিক্রমসিংহর বাঁচার রাস্তা একটাই। যত দ্রুত সম্ভব আমজনতার অবর্ণনীয় সঙ্কট প্রশমিত করা। প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার পরে তিনি দাবি করেছেন ‘বেইল আউট প্যাকেজ’ নিয়ে আইএমএফের সঙ্গে আলোচনা নাকি চূড়ান্ত পর্যায়ে, একই ভাবে অন্যান্য দেশের অর্থ সাহায্যের পথও দ্রুত মসৃণ হচ্ছে। যদিও আন্তর্জাতিক অর্থভাণ্ডারের পক্ষ থেকে শ্রীলঙ্কার নতুন প্রেসিডেন্টের এই দাবি নিয়ে কোনও উচ্চবাচ্যই করা হয়নি। বিক্রমসিংহ বিষয়টিকে যতটা সহজ করে দেখাচ্ছেন, বাস্তব পরিস্থিতি মোটেই তা নয়। বাজারে জ্বালানি নেই, ওষুধ নেই, প্রয়োজনানুপাতে খাবারদাবারও নেই। জনতা মনে করে তাদের এমন অস্তিত্বের সঙ্কট গোতাবায়ার প্রশাসনের ক্ষমাহীন অপরিণামদর্শিতার ফল, যা একদিনে হঠাৎ বাজের মতো মাথায় ভেঙে পড়েনি, ধীরে ধীরে তৈরি হয়ে গোটা দ্বীপভূমিকে গ্রাস করে ফেলেছে।

বিক্রমসিংহর নির্বাচনের পরেই কলম্বোর রাস্তায় বিক্ষুব্ধ মানুষের জমায়েত শুরু হয়েছে। তাদের মুখে শোনা যাচ্ছে একটিই স্লোগান, 'রনিল গো হোম’।  এই ভিড় যদি জনজোয়ারে পরিণত হয়, অবরুদ্ধ করে রাখে সংসদ ও প্রেসিডেন্টের কার্যালয়, তা হলে ধরে নিতে হবে, রক্তাক্ত হতে চলেছে শ্রীলঙ্কার আগামীকাল।
আশির দশকের শেষার্ধে গৃহযুদ্ধ কভার করতে আমাকে প্রায়শই শ্রীলঙ্কায় যেতে হতো। তখন রাজাপক্ষ পরিবারের নাম ঘূণাক্ষরেও কেউ উচ্চারণ করত না। শ্রীলঙ্কার প্রভাবশালী রাজনীতিক হিসেবে তখন পরিচিত ছিলেন বন্দরনায়েক, জুনিয়াস জয়বর্ধন কিংবা প্রেমদাস। রাজাপক্ষ পরিবারের এমন উল্কাসদৃশ উত্থান প্রধানত গত দুই দশকের ব্যাপার। পরিবারতন্ত্র কাকে বলে, কী ভাবে জমিদারদের মতো ক্ষমতার সব ক'টি ভরকেন্দ্র পরিবারে কুক্ষীগত রাখতে হয়, রাজাপক্ষরা তার নিকৃষ্টতম উদাহরণ। ঔপনিবেশিক শাসনমুক্ত দক্ষিণ এশিয়ায় ক্ষমতার শীর্ষে কোনও একটি পরিবারের অবস্থান অবশ্যই নতুন ঘটনা নয়। ভারতে নেহরু-গান্ধী, পাকিস্তানে ভুট্টো, বাংলাদেশে মুজিবর রহমান সেই প্রবণতার ধারক। কিন্তু শ্রীলঙ্কায় রাজাপক্ষরা যা করেছেন তার কাছে বাকিদের দুদুভাতু  মনে হয়।

২০০৯ সালে এলটিটিই-কে নিকেশ করে গোতাবায়ার সহোদর মাহিন্দা রাজাপক্ষর তখন স্বদেশে সিলভেস্টার স্ট্যালোনের মতো সুপারসহিরো ইমেজ। সিকি শতক ধরে দ্বীপভূমিকে ত্রস্ত করে রাখা তামিল গেরিলাদের মাহিন্দার কোনও পূর্বসূরি উচিত শিক্ষা দিতে পারেননি। ঠিক সেই সময় কলম্বোর ক্ষমতার অলিন্দে চার রাজাপক্ষ ভাইয়ের অবস্থান কী ছিল, একবার দেখে নেওয়া যাক। মাহিন্দা প্রেসিডেন্ট, গোতাবায়া প্রতিরক্ষা সচিব, বাসিলের হাতে আর্থিক উন্নয়ন মন্ত্রক এবং চামাল সংসদের স্পিকার। শ্রীলঙ্কা তখন পরিচালিত হয় রাজাপক্ষ পরিবারের ডিনার টেবিল থেকেই।

রাজাপক্ষদের পিতৃদেব আলভিন ছিলেন স্বাধীনতা সংগ্রামী, সম্মাননীয় রাজনৈতিক নেতা ও শ্রীলঙ্কা ফ্রিডম পার্টির প্রতিষ্ঠাতা। কিন্তু তিনি ছিলেন আঞ্চলিক নেতা, পরিবারের খাসতালুক হানামকোন্ডার বাইরে তাঁর প্রভাব প্রতিপত্তি ছিল না। কিন্তু তাঁর পরবর্তী প্রজন্ম ছিল অনেক বেশি উচ্চাশাসম্পন্ন। তাঁদের পাখির চোখ নিবদ্ধ ছিল কলম্বোর রাজনীতির ওপর। রাজাপক্ষদের ৯ ভাই-বোনের মধ্যে চতুর্থ মাহিন্দাই প্রথম ২০০৫-এর ভোটে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়ে সক্কলকে তাক লাগিয়ে দেন। ক্ষমতায় বসেই এক এক করে আরও তিন সহোদরকে ডেকে নিয়ে তাঁদের মধ্যে ক্ষমতার বিলি বণ্টনটুকু সেরে নেন তিনি। মার্কিন মুলুকে দীর্ঘদিন কাটানোর পরে ভাইকে সাহায‍্য করতে দেশে ফেরেন গোতাবায়া।

গোতাবায়ার পেশা-জীবন কেটেছে শ্রীলঙ্কার সামরিক বাহিনীতে। ১৯৯১ সালে লেফটেনান্ট কর্নেল হিসেবে তিনি অবসর নেন। টাইগার নিধন যজ্ঞে অন্তরাল থেকে সবচেয়ে সক্রিয় ভূমিকা গোতাবায়াই পালন করেছিলেন, লোকে তার নাম দিয়েছিল ‘দ্য টার্মিনেটর’। ২০১৫-য় মাহিন্দা ভোটে পরাজিত হলে ভীম-নকুল-সহদেবও সরকারি দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়ান। চার বছর পরে ‘টার্মিনেটর’-ই ভোটে জিতে দ্বীপভূমির প্রেসিডেন্ট হন। শাসনকালের মেয়াদ তিন বছর ফুরোনোর আগেই লঙ্কাকাণ্ড বাধিয়ে তিনি দেশান্তরী হতে বাধ্য হলেন। 
কেন সেটা এখন ইতিহাস।

Leave a comment

Your email address will not be published.