logo

স্বাভাবিক পরিস্থিতি বলে কিছু হয় কি?

  • August 12th, 2022
Suman Nama, Troubledtimes

স্বাভাবিক পরিস্থিতি বলে কিছু হয় কি?

স্বাভাবিক পরিস্থিতি বলে কিছু হয় কি?

সুমন চট্টোপাধ্যায়

কথাটা আমি শুনেছি, শুনছি, শুনেই চলেছি।

ধরে নিচ্ছি, আপনারাও তাই।

‘যখন পরিস্থিতি একটু স্বাভাবিক হবে।’

রোজই ভাবি, আজ আবার মনে হল, সত্যিই তো এমন অস্বাভাবিক পরিস্থিতি আর কত দিন চলবে?

পরক্ষণেই মনে হল, না সম্পূর্ণ ভুল। ইতিহাসের যে কোনও মনোযোগী ছাত্র বলবেন, ২০২০-কে অস্বাভাবিক বছর হিসেবে দেগে দেওয়াটা ভুলই হবে।

১০০ বছর আগে, একটা বিশ্বযুদ্ধের মাঝখানে যে মহামারী হয়েছিল করোনার তুলনায় সেটা ছিল অনেক বেশি ভয়াবহ। ঠিক তার পরেই নেমে এসেছিল মহামন্দা, গ্রেট ডিপ্রেশন। ১৯৫০-এর দশকেও কি দুনিয়ায় মহামারী হয়নি? ১৯৬৮ সালে, একদিকে যখন নাগরিক অধিকার আন্দোলন নিয়ে পশ্চিমী দুনিয়া উত্তাল অন্যদিকে তখনই শুরু হয়েছিল ফ্লু মহামারী। এক মার্কিন মুলুকেই মারা গিয়েছিলেন লাখ খানেক মানুষ, গোটা দুনিয়ায় কম করেও দশ লক্ষ। আমার জীবদ্দশায় অন্তত এমন একটি দশকের কথা মনে পড়ে না যাকে চোখ বুজে ‘স্বাভাবিক’ বলে মেনে নেওয়া যায়।

বিগত দু’টি দশকের কথাই ধরা যাক। সহজ ও স্বাভাবিক পরিস্থিতি কী ছিল? নিউ ইয়র্কের টুইন টাওয়ার ধ্বংস হয়ে তিন হাজার মানুষের অকাল মৃত্যু হয়েছিল সন্ত্রাসবাদী হানায়। ঠিক তার অব্যবহিত পরেই শুরু হল আর্থিক সঙ্কট, ভয়াবহতার মানদণ্ডে যা অবশ্যই গ্রেট ডিপ্রেশনের সঙ্গে তুলনীয়। এখন একইসঙ্গে আমরা মোকাবিলা করছি অতিমারী আর আর্থিক সঙ্কটের যুগলবন্দির সঙ্গে।

বাইবেলে লেখা আছে,” The thing that hath been… it is that which shall be, and that which is done is that which shall be done, and there is no new thing under the sun. That which hath been is now and that which is to be hath already been, and God requireth that which is past.”

বাইবেলের কথার প্রতিধ্বনি শুনতে পাই প্রবল পরাক্রমশালী রোমান সম্রাট মার্কাস অরেলিয়াসের বিখ্যাত উক্তিতে,” Whatever happens has always happened and always will, and is happening at this very moment , everywhere. Just like this,” দাশনিক নিটশে কি একেই “eternal recurrence” বলেননি?

তার মানে, এই ভাবে ভেবে দেখলে মনে হয় দুনিয়ায় যা ঘটে সবই স্বাভাবিক। কোনও কিছুর মধ্যেই যেন অস্বাভাবিকতা নেই। একমাত্র বিস্ময় হল এই যে আমরা তবু বিস্মিত হই। জীবন আসলে জীবনই।

কোনও সন্দেহ নেই উপায় থাকলে আপনি দিনের পর দিন, মাসের পর মাস ‘ওয়ার্ক ফ্রম হোম’ করতেন না। স্বাধীন ভাবে নিজের ডানা মেলে উড়ে বেড়াতে চাইতেন। কিন্তু কে সত্যিই মাথার দিব্যি দিয়ে বলতে পারে, সেই পরিস্থিতি থাকা বা না থাকা আসলে ‘স্বাভাবিক’ ঘটনা? অতএব ধৈর্যের পরীক্ষা দিয়ে হাত গুটিয়ে বসে থাকাটা অনর্থক। একটু গভীরভাবে ভেবে দেখবেন, সেক্ষেত্রে আপনি আসলে অপেক্ষা করছেন জীবন সাঙ্গ হওয়ার মুহূর্তটির জন্য। অথচ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তটি হল এখন। ‘ নাও, দিস মোমেন্ট।’

ইতিহাস পড়ার একটা বড় সুবিধে হল এক ধরনের নৈর্ব্যক্তিক পরিপ্রেক্ষিত মনের মধ্যে তৈরি হয়। সময়ের দূরত্ব যত বাড়ে ধারণা তত স্পষ্ট হয়, অনেকটা কুয়াশা কেটে যাওয়ার পরে ঝকঝকে আলোর মুখে দাঁড়ানোর মতো। আমরা যখন ইনফ্লুয়েঞ্জা মহামারির কাহিনি পড়ি কিংবা শেক্সপীয়ারের চরিত্রগুলির মর্মে প্রবেশ করার চেষ্টা করি কিংবা কোনও পুরোনো যুদ্ধক্ষেত্র বা দুর্গের সামনে এসে দাঁড়াই, আমরা বিলক্ষণ বুঝতে পারি অতীতটা আসলে কেমন যেন বর্তমানের মতোই ছিল। বুঝতে পারি আমাদের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র পরিকল্পনা বা আকাঙ্খাগুলি অসীম সময়ের বিস্তীর্ণ প্রেক্ষাপটে কতটা তুচ্ছ, কতটা অকিঞ্চিৎকর। এই উপলব্ধির মধ্যে ব্যক্তিগত কোনও ব্যাপার নেই। ব্যাপারটা আসলে এই রকমই।

ইতিহাস হিংস্র, ইতিহাস প্রস্তরখন্ডের মতো কঠিন, আবার একই সঙ্গে চরম বিভ্রান্তিকর ও অপ্রতিরোধ্য। ইতিহাস সমকালীন মানুষের ভালো-মন্দের তোয়াক্কা করেনা কারণ শেষ বিচারে ইতিহাস হল জীবনের রেকডিং আর জীবন তো আসলে এই রকমই। তার মানে কি এই যে এমন সর্বগ্রাসী নৈরাজ্যের মধ্যে আমরা শান্তি বা সুখ খুঁজে নিতে পারিনা? স্বাভাবিক পরিস্থিতি বলে কিছু হয়না যখন আমাদের তখন উদ্বেগ আর অবসাদই হবে ভবিতব্য?

ঠিক উল্টোটা।

মিলান কুন্দেরা তাঁর The Unbearable Lightness of Being-এ লিখেছেন,’ No matter how brutal life becomes, peace always reigns in the cemetery. Even in wartime, in Hitler’s time, in Stalin’s time, through all occupations……. against the backdrop of blue hills, they were as beautiful as lullaby.

আমারও ইদানীং একই কথা মনে হচ্ছে। সন্দেহ নেই এক বিচিত্র বিভীষিকাময় সময়ের মধ্যে দিয়ে চলেছি আমরা।এমন একটা সময় আসুক, আমি-আপনি কেউই তা চাইনি, চাইতে পারিনা। যদি আমার সামনে কোনও বিকল্প থাকত।কিন্তু আমার হাতে তো সত্যিই কোনও বিকল্প নেই, এটাই যে জীবন।

অতএব ভালো অথবা অন্যরকম সময় একদিন আসবে ভেবে আমি কাতর হতে যাব কেন? যখন জানি এখন, এই মুহূর্তটাই আসল।আমার কাছে একমাত্র প্রাসঙ্গিক ঘটনা হল আজ সকালেও ঘুম থেকে উঠে আমি সূর্যের মুখ দেখেছি, গত দশ মাসে চারদিকে এত মৃত্যু, স্বজন-বিয়োগের হাহাকারের মধ্যেও আমি বেঁচে আছি। মানে আমি বেঁচে থাকতে পেরেছি।এই ভাবে আর কত দিন চলবে? কতোদিন পরে পরিস্থিতিতে আসবে পরিবর্তন? দুনিয়া ছানবিন করে এমন একজন পণ্ডিতের নামও বলতে পারবেননা যাঁর কাছে এ সব প্রশ্নের সদুত্তর আছে। নিশ্চিত করে কেউ কিছু বলতে পারবেন না, দার্শনিকের বৈরাগ্য নিয়ে কেউ কেউ বলবেন যে সব কিছুরই একটা শেষ আছে, তাই একদিন না একদিন এই পরিস্থিতি ঠিক বদলে যাবে।

মানুষ যদি যুদ্ধের মধ্যে, দানবীয় শাসনের মধ্যে এবং করোনার চেয়ে অনেক বেশি ভয়ঙ্কর মহামারির মধ্যে থেকেও জীবনের শান্তি ও সুখ খুঁজে বার করতে সক্ষম হয়ে থাকে তাহলে আমি-আপনি কোন অজুহাত দেখিয়ে আত্মরক্ষা করব?

একটাও নয়। কেন না এটাই স্বাভাবিক।

এটাই জীবন।

আসুন, তাকে স্বীকার করে ভালোবাসি।

নান্য পন্থা বিদ্যতে !

Leave a comment

Your email address will not be published.