logo

বুদ্ধ ও নির্বাণ (পর্ব-৭)

  • August 16th, 2022
Memoir

বুদ্ধ ও নির্বাণ (পর্ব-৭)

সুমন চট্টোপাধ্যায়

বড় খবর ‘মিস’ করার মর্মবেদনা কতটা মারাত্মক, তা কেবল খবরের কারবারিরাই জানে। অন্য কাগজে আছে আমার কাগজে নেই এমন কোনও ভালো খবর চোখে পড়লেই আমার বাকি দিনটা বরবাদ হয়ে যেত, অসম্ভব মনোকষ্ট হতো, মনে হতো যেন জীবনটাই বৃথা হয়ে গেল। মাঠে-ময়দানে নেমে যখন রিপোর্টারি করতাম, অন্য কাগজের কাছে কোনও একদিন গোল খেলে পরের দিন তিন গোল দেওয়ার জেদ চেপে বসত। ১৯৯৩-এ কলকাতায় ফিরে আনন্দবাজারের দায়িত্ব নেওয়ার পরে আর সে উপায় ছিল না, অন্যের হাতে তামাক খাওয়াটাই তখন দস্তুর।

তেমনই একটি খবর ছিল জ্যোতি বসুর মন্ত্রিসভা থেকে বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের সহসা নাটকীয় পদত্যাগ। কখন যে তিনি চুপিচুপি মহাকরণ থেকে বের হয়ে গিয়েছেন, তাবড় তাবড় রিপোর্টাররা সেটা বুঝতেই পারেনি। পরের দিন খবরটি প্রকাশিত হয়েছিল একমাত্র আজকালে। বন্ধু অশোক দাশগুপ্তকে ডেকে নিয়ে খবরটি দিয়েছিলেন বুদ্ধবাবু স্বয়ং।

এ পর্যন্ত সবাই জানে। কিন্তু কেন এবং কোন পরিস্থিতিতে বুদ্ধবাবু আচমকা এমন একটি সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, সেই রহস্যের বিশ্বাসযোগ্য কিনারা আজ পর্যন্ত হয়নি। আমি সিপিএম নেতাদের জনে-জনে জিজ্ঞাসা করেছি, প্রশ্ন করার যত কৃৎকৌশল আছে তার সব ক’টি প্রয়োগ করেছি, সদুত্তর পাইনি। বিদেশে খুবই ভালো মুডে পেয়ে জ্যোতিবাবুর কাছে জানতে চেয়েছি, উনি শুধু একটু মুচকি হেসেছেন। জ্যোতিবাবুর সঙ্গে বুদ্ধবাবুর ভুল-বোঝাবুঝি মেটানোয় সে সময় যিনি সবচেয়ে সক্রিয় ভূমিকা নিয়েছিলেন, সেই সোমনাথ চট্টোপাধ্যায়ের পেট থেকে জবাবটি বের করার চেষ্টা করেছি, পারিনি। কোনও লাভ নেই জেনেও অনিল বিশ্বাসের কাছে জানতে চেয়েছি ‘দোস্তকা ইতনা গুস্‌সা কিঁউ হোতা হ্যায়?’ সরু গলায় নস্যি নিতে নিতে তিনি জবাব দিয়েছেন, ‘পার্টির খবর জিজ্ঞেস করো বলব, রাইটার্সের খবর আমি জানব কী করে? কোনও দিন আমায় সেখানে দেখেছ?’ অনেক পরে বুদ্ধবাবুর মুখ্যমন্ত্রিত্ব কালে আমার সঙ্গে যখন তাঁর গনগনে ঊষ্ণ সম্পর্ক, আমি জিজ্ঞাসা করে বসেছিলাম, ‘সেদিন জ্যোতিবাবুর সঙ্গে আপনার কী হয়েছিল বলুন তো?’ তাঁর সহাস্য জবাব ছিল, ‘ও সব প্রসঙ্গ এখন থাক না।’ থেকে গেল তো থেকেই গেল।

সে সময় একটি কথা খুব রাষ্ট্র হয়েছিল, বুদ্ধবাবু নাকি জ্যোতিবাবুর মুখের ওপর বলে এসেছিলেন চোরেদের মন্ত্রিসভায় তিনি থাকতে চান না। আমি এই প্রচারে কখনও কর্ণপাত করিনি, এখনও করি না। আর পাঁচটি বিষয়ে তাঁর যত দুর্বলতাই থাক, এ ধরনের চিৎপুর-মার্কা ডায়ালগ দেওয়ার মানুষ তিনি নন, এ সব তাঁর রুচি বিরুদ্ধ। বাইরে থেকে লক্ষ্য করে যেটুকু বুঝতাম সে সময় বুদ্ধবাবু কথায় কথায় রেগে যেতেন, প্ররোচনা ছাড়াই এমন সব মন্তব্য করতেন যার জন্য পরে তিনি সম্ভবত নিজেও লজ্জাবোধ করতেন।

দু’টি উদহারণ দেওয়া যাক। সিপিআই নেত্রী, সর্বজনশ্রদ্ধেয়া, গীতা মুখোপাধ্যায়ের প্রসঙ্গ নিয়ে প্রশ্ন ওঠায় বুদ্ধবাবু মেজাজ হারিয়ে বললেন, ‘উনি কে, কত মানুষের প্রতিনিধিত্ব করেন?’ আবার বহরমপুর পুরসভা কংগ্রেস দখল করেছে শুনে তাঁর মন্তব্য ছিল, ‘চোরেদের হাতে পুরসভাটা চলে গেল।’ আমার মনে হয়েছে সাময়িক ভাবে হলেও সে সময় তিনি নিজের মেজাজের ওপর নিয়ন্ত্রণ সম্পূর্ণ খুইয়ে বসেছিলেন। জ্যোতিবাবুর সঙ্গে সঙ্ঘাতও হয়েছিল এই কারণেই। বছর দু’য়েক পরে জ্যোতিবাবুর সঙ্গে মার্কিন সফরে গিয়েছিলাম, সঙ্গে ছিলেন গণশক্তির সম্পাদক অভীক দত্ত। একদিন আড্ডা মারার সময় কথায় কথায় অভীক বুঝিয়ে দিয়েছিল আমার ধারণা সম্পূর্ণ ভ্রান্ত নয়। আমাদের প্রজন্মের সিপিএম নেতাদের মধ্যে অভীকের বিশেষ গুরুত্ব ছিল। বুদ্ধবাবু এবং অনিলদা দু’য়েরই তিনি অত্যন্ত স্নেহভাজন ছিলেন। গণশক্তির সম্পাদনা ছাড়াও ২৪ ঘণ্টা খবরের চ্যানেলও এক সময় তাঁরই নিয়ন্ত্রণে ছিল। শহরের অনেক ব্যবসায়ী আর দলের মধ্যে সেতু বন্ধনের গুরুত্বপূর্ণ কাজটাও তাঁকে দেওয়া হয়েছিল। অভীকের অকাল মৃত্যুর কথা মনে পড়লে বড্ড কষ্ট হয়, মার্কিন মুলুকে এক সঙ্গে একই ঘরে থাকার খণ্ড খণ্ড স্মৃতিচিত্রগুলি মনের পর্দায় ভেসে ওঠে। অসময়ে অভীকের চলে যাওয়াটা রাজ্য সিপিএমের একটা বড় ক্ষতি অবশ্যই।

তারপর হুগলি দিয়ে অনেক জল বয়ে গেল, উপর্যুপরি অপমান সহ্য না করতে পেরে আমি আনন্দবাজার গোষ্ঠীর সঙ্গে টানা ২২ বছরের সম্পর্ক একদিন ছিন্ন করে ফেললাম। তখন আমি স্টার আনন্দের দায়িত্বে, কয়েক মাস আগেই চালু হয়েছে চ্যানেল, বেশ নামডাকও হয়েছে। সম্ভবত ২০০৫-এর নভেম্বরের ঘটনা। আমি বুদ্ধবাবুর অ্যাপয়েন্টমেন্ট চাইলাম, উনি আলিমুদ্দিনে এসে দেখা করতে বললেন। গিয়ে দেখি, সাধারণত অনিল’দা যে ঘরটিতে বসতেন সেখানেই মুখ্যমন্ত্রী বসে আছেন। একা। ঘর-ভর্তি সিগারেটের ধোঁয়া, আমার মতো ধূমপায়ীরও প্রথম দিকে একটু কষ্ট হল। কথা সামান্য এগোতেই বুদ্ধবাবু বললেন, ‘আপনার পুরোনো বস গতকাল এখানে আমার সঙ্গে দেখা করতে এসেছিলেন, সঙ্গে ছিলেন কে কে বিড়লা। আপনি এ ভাবে ছেড়ে দেওয়ায় উনি খুব দুঃখ পেয়েছেন মনে হল।’

আমি বললাম, ‘ছাড়িনি তো, ছাড়তে বাধ্য হলাম। বাবুর বাড়ির চাকরিতে লাথি-ঝাঁটা খেতে হবে আমি মানি। খেয়েওছি অনেক। তবু একটা বিন্দু আসে যার পরে আর আত্মসম্মান বিকিয়ে থাকা যায় না।’

বুদ্ধবাবু নিরুত্তর, অফিসের অভ্যন্তরীণ বিষয় নিয়ে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীকে আর কিছু বলতে ইচ্ছে করল না। আমার না থাক তাঁর সময়ের দাম তো অনেক।

অন্য কথায় চলে গেলাম। কিছুক্ষণ পরে বুদ্ধবাবু আবার আমার ইস্তফার প্রসঙ্গ টেনে আনলেন। হঠাৎ আমার মুখ থেকে বেরিয়ে গেল, ‘একদিন আপনিও তো জ্যোতিবাবুর মন্ত্রিসভা থেকে রেগেমেগে ইস্তফা দিয়েছিলেন, তার বেলা?’

মুখ্যমন্ত্রী আমার খোঁচাটা গায়ে মাখলেন না। উল্টে বললেন, ‘হ্যাঁ আমিও করেছিলাম। তবে আমার একটা মস্ত ফলব্যাক ছিল, সেটা হল পার্টি। এটা ভুললে তো চলবে না।’

এই সেদিন পর্যন্ত যে মানুষটাকে উঠতে বসতে গালাগাল দিয়েছি, আমার বিপন্নতা দেখে তাঁর এমন দুর্ভাবনা সত্যিই হৃদয় ছুঁয়ে গিয়েছিল। তিনি রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী, সর্বেসর্বা, আমার মতো দু’কড়ির খবরওয়ালাকে নিয়ে তাঁর একটি মিনিটও নষ্ট করার কোনও প্রয়োজন ছিল না। তবু তিনি করেছিলেন। কেন না তার অনেক আগে থেকেই আমি ‘বৌদ্ধ’ হয়ে গিয়েছিলাম যে! (চলবে)

ছবি: ইতালির ভ্যাটিকানে বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের সঙ্গে লেখক

Leave a comment

Your email address will not be published.