logo

বুদ্ধ ও নির্বাণ (পর্ব-৬)

  • August 16th, 2022
Memoir

বুদ্ধ ও নির্বাণ (পর্ব-৬)

সুমন চট্টোপাধ্যায়

পূর্বসূরির সঙ্গে নিজের পার্থক্য বোঝাতে বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য প্রায়শই একটি কথা বলতেন, ‘রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে নাম ধরে ব্যক্তিগত আক্রমণ করার আমি বিরোধী। একে আমি রুচিসম্মত কাজ বলে মনে করি না।’ দাবিটি ষোলো আনা সত্য।

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের উল্কার মতো উত্থানের পিছনে সিপিএম নেতাদের ব্যক্তিগত গালাগালি কত বড় ভূমিকা পালন করেছে তা নিয়ে বিশদানুসন্ধান জরুরি। অনেক সময় সেই গালাগালির ভাষা ছিল এতটাই কদর্য যে কাগজে ছাপতে পারিনি। জ্যোতি বসু শুরু করেছিলেন এই আক্রমণের পালা, তারপর ধীরে ধীরে অনেকেই তাতে যোগ দিয়েছেন— বিমান বসু, বিনয় কোঙার, অনিল বসু, সুশান্ত ঘোষ প্রভৃতি। গালাগালের খেলায় এ বলে আমায় দ্যাখ তো ও বলে আমায়।

রাজনীতিতে এটি পরীক্ষিত সত্য যে লাগাতার গালাগালি শেযমেশ যে গালাগালি খাচ্ছে, তাকেই সাহায্য করে। যে গালাগালি দেয়, তার কপালে ভক্তবৃন্দের হাততালি ভিন্ন কিছুই জোটে না যে গালাগালি খায় ধীরে ধীরে তার পক্ষে তৈরি হয় প্রথমে সহানুভূতি, তারপরে সমর্থন। গালাগালি প্রতিপক্ষকে ক্ষণিকের জন্য বিদ্ধ করলেও করতে পারে, কিন্তু এটাই তার গুরুত্বের চরম স্বীকৃতি। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় মহিলা বলে বাড়তি সুবিধে পেয়েছেন। সিপিএম নেতারা তাঁর সমালোচনায় যত বেশি কর্কশ হয়েছেন, ততই মানুষের মনে প্রশ্ন জেগেছে, কতগুলো দামড়া লোক মিলে একটি মেয়ের পিছনে এ ভাবে লেগেছে কেন? জানি না অতীতের হিসেব কষতে গিয়ে সিপিএম একে ‘ভুল’ বলে চিহ্নিত করবে কি না। সহসা করবে না আমরা জানি, চোর পালিয়ে যাওয়ার অন্তত ২০ বছর পরে বুদ্ধি বাড়ে কমিউনিস্টদের।

ঠিক যেমন ১৯৯৩-এর ৭ জানুয়ারি মহাকরণে মমতাকে পুলিশ দিয়ে ও ভাবে নিগ্রহ করানো ছিল আরও একটি মস্ত ভুল। আগে থেকে মুখ্যমন্ত্রীর অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিয়ে মমতা সে দিন মহাকরণে যাননি এ কথা যেমন ঠিক, তেমনি এ কথাও ঠিক জ্যোতিবাবুর সঙ্গে খোশ-গপ্পো করতেও তিনি যাননি। একটি অতি মানবিক, স্পর্শকাতর বিষয় রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীর গোচরে আনতে গিয়েছিলেন। আমি তাঁকে পছন্দ করি আর নাই করি, সত্যটা হল মমতা তখন দ্বিতীয়বার জিতে আসা সাংসদ, কেন্দ্রে রাষ্ট্রমন্ত্রী। যশস্বী বামপন্থী সাংবাদিক, জ্যোতিবাবুর সঙ্গে বিলেতবাসী, নিখিল চক্রবর্তী তাঁর ‘মেইনস্ট্রিম’ সাপ্তাহিকে নিজের কলামে এই ঘটনার তীব্র নিন্দা করে বাম-প্রশাসনকে তুলোধোনা করে ছেড়েছিলেন। তিনি লিখেছিলেন, ‘Would the heavens have fallen if the Chief Minister of West Bengal had cared to spend a few minutes with the hapless victim brought to his doorstep by a Union Minister and a lady MP? And would ministerial protocol have been defiled if Jyoti Basu, with all his dislike for Mamata Banerjee had met the Union Minister waiting to see him?’ প্রশ্নটি উঁকি মেরেছিল পশ্চিমবঙ্গের জনতার অনেকের মনেই।

নিখিলবাবু এখানেই থেমে থাকেননি। মমতা ইচ্ছে করে মহাকরণে ঢুকে শান্তি-শৃঙ্খলায় বিঘ্ন ঘটানোর চেষ্টা করেছেন, সিপিএম নেতাদের এই অভিযোগও তিনি ফুৎকারে উড়িয়ে দিয়ে ২০ বছরের পুরোনো একটি ঘটনা তাঁদের স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন। লিখেছেন, ‘সিপিএম নেতারা একথা ভুলে গেলেন কী করে যে ২০ বছর আগে তাঁদের কর্মচারীরাই মহাকরণের একই অলিন্দে তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী অজয় মুখোপাধ্যায়কে শারীরিক নিগ্রহ করেছিলেন। এ বিষয়েও তো তাঁরাই পথিকৃৎ।’

দীর্ঘ নিবন্ধের উপসংহারে নিখিল চক্রবর্তী লিখছেন, ‘It has revealed how our political leaders, no matter how impressive their image building has been are getting cooped up in the groove of narrow politics unable to realise the world has been changing fast. This is a world that demands discarding of arrogance and intolerance and cultivating in their place fellow-feeling and mutual understanding even with the most implacable of one’s adversaries. There is no room for hollow politics.’

১৯৯৩-এর পশ্চিমবঙ্গে খবরের কাগজগুলিতে নিখিলবাবুর এই কথাগুলিই নানা ভাবে, নানা জনের ভাষায় উচ্চারিত হতে শুরু করেছিল, ঘুরে-ফিরে, বারেবারে শিরোনামে আসছিল একটাই নাম। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। এ ভাবে কিছুতেই আসত না যদি ৭ জানুয়ারি মহাকরণে সিপিএমের পুলিশ ওই ন্যক্কারজনক ঘটনাটি না ঘটাত। অবশ্য বিপুল গরিষ্ঠতার গর্বে ণত্ব-ষত্ব জ্ঞান হারানো সিপিএম নেতাদের এমতো ধম্মের কথা শোনার না ছিল সময়, না অভিপ্রায়। উচিত কথাটি বললেই শুনতে হতো ‘মমতার দালাল’। যা এখন সিপিএমের প্রাপ্ত ভোটের মতো কমতে কমতে কিছু গণ্ডমূর্খের ভাষায় ‘চটি-চাটা’-য় পর্যবসিত হয়েছে। কলকাতায় ফিরে আমার নতুন উপলব্ধিটি হলো, নতুন এক বিরোধী নেত্রীর আবির্ভাব হয়েছে আমাদের রাজ্যে যিনি ব্যাকরণের বই মেনে রাজনীতি করেন না।

অবিসংবাদিত বিরোধী নেত্রীর গ্রহণযোগ্যতা পেতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আর যেটুকু পথ পার হওয়ার প্রয়োজন ছিল, সেটা করে দিল ২১ জুলাইয়ের ঘটনা। রাজনৈতিক অশান্তি, দলে দলে রক্তারক্তি, পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ, কোনও কিছুই বাংলার রাজনীতিতে নতুন ব্যাপার ছিল না। তবু পুলিশের গুলিতে একই জায়গায় ১৩জন মানুষের মৃত্যুর ঘটনা ছিল তখন পর্যন্ত বেনজির। সেদিন আরও অনেকের সঙ্গে মমতাও আহত হয়েছিলেন, তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করাতে হয়েছিল, দেশ-জুড়ে শোরগোল পড়ে গিয়েছিল। নিন্দায় মুখর হতে শোনা গিয়েছিল বাম সমর্থকদের অনেককেই।

এত বড় একটি ঘটনা ঘটে গেল অথচ কার নির্দেশে গুলি চলল সেই ব্যক্তিটি অরণ্যদেবের মতো গভীর জঙ্গলে মিলিয়ে গেলেন। কেউ দায়িত্ব নিলেন না, কাউকে দায়ী করাও হলো না। উল্টে পুলিশি বীভৎসাকে প্রকাশ্যে বারেবারে সমর্থন করে সিপিএম নেতারা তাঁদের জেদি, হিংস্র মুখটাই বে-আব্রু করে দিলেন। কারণ একটাই। বিধানসভায় বিপুল গরিষ্ঠতা।

অথচ ইচ্ছে করলে জ্যোতিবাবু-বুদ্ধবাবু কৌশলগত নমনীয়তা দেখাতে পারতেন। প্রতীকী কিছু একটা করে দেখাতে পারতেন পুলিশের আচরণে তাঁরাও চিন্তিত, মৃতদের প্রতি সমান সমব্যথী। একটি বিচারবিভাগীয় তদন্তের আদেশ দিলেও বামেদের প্রতিপত্তি এক ছটাকও দুর্বল হতো না। বরং বামফ্রন্টের ভাবমূর্তিই কিছুটা উজ্জ্বল হতো, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পালে লাগত না ঝোড়ো হাওয়া। তা না করে ক্ষমতান্ধতাকেই তাঁরা মনে করলেন কর্তৃত্ব জাহির করার একমাত্র পথ। কিন্তু অন্ধ হলে কি প্রলয় বন্ধ থাকে? (চলবে)

Leave a comment

Your email address will not be published.