logo

বুদ্ধ ও নির্বাণ (পর্ব-৪)

  • August 16th, 2022
Memoir

বুদ্ধ ও নির্বাণ (পর্ব-৪)

সুমন চট্টোপাধ্যায়

১৯৮৫ সালে আমি যে কলকাতা ছেড়েছিলাম, '৯৩ সালে সেই শহরে আমি প্রত্যাবর্তন করিনি। ইতিমধ্যে স্থানীয় রাজনীতিতে বাম-বিরোধিতার প্রধান মুখ হয়ে উঠে এসেছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁকে নিয়েই মিডিয়ার যত মাতামাতি, সিপিএম নেতাদের আক্রমণের প্রধান লক্ষ্যও তিনি। প্রিয়, সুব্রত, সোমেন, গনিখান, প্রণব, আছেন সবাই। তবে পার্শ্ব-চরিত্রে। এই নাটকীয় উত্থানই তারপর থেকে পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতির নির্ণায়ক হয়ে উঠল ধীরে ধীরে। ২০১১-তে তো বামেদের ক্ষমতাচ্যুতই হতে হল।

১৯৯৩-এর দু’টি তারিখ একেবারে টালমাটাল করে দিয়েছিল বাংলার রাজনীতিকে, গোটা দেশের মিডিয়ায় পশ্চিমবঙ্গ উঠে এসেছিল শিরোনামে। ৭ জানুয়ারি আর ২১ জুলাই। কী হয়েছিল এই দু’টি দিনে, রাজনীতি মনস্ক সব মধ্যবয়সি বাঙালি তা জানে। তরুণতর প্রজন্মের যাঁরা জানেন না, তাঁদের অবগতির জন্য অতি সংক্ষেপে ঘটনা দু’টির সারাৎসার জানিয়ে রাখা প্রয়োজন।

প্রথমে ৭ জানুয়ারি।নদিয়ার একটি গ্রামে এক হতদরিদ্র মূক ও বধির কিশোরী ধর্ষিতা হন। যাঁর বিরুদ্ধে ধর্ষণের অভিযোগ ওঠে তিনি এলাকার পরিচিত সিপিএম কর্মী। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তখন কেন্দ্রে নরসিংহ রাও সরকারে রাষ্ট্রমন্ত্রী। ধর্ষিতা মেয়েটির মা মমতার কাছে অভিযোগ জানান, পুলিশ ওই অভিযুক্তের বিরুদ্ধে এফআইআর নিতেই রাজি হচ্ছেন না। মমতা সেই মেয়ে আর তার মাকে নিয়ে সোজা মহাকরণে হাজির হন। বলেন, তিনি মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করে পুলিশি নিষ্ক্রিয়তার অভিযোগ জানাতে চান। জ্যোতি বসু দেখা করতে রাজি হন না। তাঁর সচিবালয় থেকে জানানো হয়, চাইলে মমতা আগে থেকে অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিয়ে দেখা করতে আসতে পারেন কিন্তু এমন রবাহুতের মতো এসে তিনি মুখ্যমন্ত্রীর দর্শন পাবেন না। ক্ষুব্ধ মমতা মুখ্যমন্ত্রীর ঘরের সামনে অবস্থান বিক্ষোভে বসে পড়েন, তাঁর কিছু অনুগামী সেখানে জুটে যায়, মিডিয়ার লোকজন দৌড়ে আসে, মহাকরণের কৌতূহলী কর্মচারীদের ভিড় বাড়তে থাকে। চোখের নিমেষে পুলিশ কর্ডন তৈরি হয়ে যায়। রাজ্য সরকারের সদর কার্যালয়ে অকস্মাৎ শুরু হয় নাটক, তুঙ্গে ওঠে উত্তেজনা।

এরপরেই শুরু হয় দু’পক্ষের চাপান-উতোর, টানটান স্নায়ুর লড়াই। মুখ্যমন্ত্রীর সচিবালয় থেকে বলা হয়, অ্যাপয়েন্টমেন্ট চেয়ে মমতা নিজেই ফোন করেছিলেন, তাঁকে স্পষ্ট জানিয়ে দেওয়া হয়েছিল আজ দেখা করা যাবে না। এতৎসত্ত্বেও তিনি ইচ্ছে করে গেট-ক্র্যাশ করতে চাইছেন নাটক করার জন্য।

পাল্টা জবাবে মমতা বলতে থাকেন, তিনি একজন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী। একটি অত্যন্ত স্পর্শকাতর বিষয় মুখ্যমন্ত্রীকে জানাতে এসেছেন, তিনি দু’মিনিট সময় দেবেন না কেন? জ্যোতিবাবুর এত দম্ভ কীসের?

মহাকরণের অলিন্দে মুখ্যমন্ত্রীর ঘরের সামনে বেশ কিছুক্ষণ চেঁচামেচি, হই হট্টগোল চলতেই থাকে। হঠাৎ মুখ্যমন্ত্রীর সচিবালয় থেকে পুলিশের কাছে নির্দেশ আসে প্রয়োজনে বলপ্রয়োগ করে ধরনা-অবস্থান তুলে দেওয়ার। আদেশ পেয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে পুলিশ। মমতার চুলের মুঠি ধরে ধাক্কা দিতে দিতে সিঁড়ি দিয়ে নামানো হয়। নীচেই অপেক্ষারত ছিল পুলিশের একটা মস্ত কালো ভ্যান, মমতাকে তাতে উঠিয়ে নিয়ে যাওয়া হয় লালবাজারে। মাঝরাতের পরে পুলিশ আবার মমতাকে ধাক্কা দিতে দিতে লালবাজারের গেটের বাইরে বের করে দেয়।

ঘটনাস্থলে উপস্থিত মিডিয়ার উপরেও পুলিশ বেপরোয়া হামলা চালায়, অনেকগুলি ক্যামেরা ভাঙে, চোট পান বেশ কয়েকজন রিপোর্টার। প্রতিবাদে রিপোর্টাররা সিদ্ধান্ত নেন, পরপর তিন দিন তাঁরা রাজ্যের কোনও মন্ত্রীর অনুষ্ঠান কভার করবেন না।

তার কয়েকদিন পরে বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য ওই অলিন্দের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ প্রেস কর্নারটি গুঁড়িয়ে দেওয়ার আদেশ দেন। তিনি অভিযোগ করেন, মমতার অবস্থান বিক্ষোভে মিডিয়ার লোকজন উৎসাহ দিয়েছিল, সে জন্যই হয়েছিল এমন বাড়াবাড়ি। ফলে মিডিয়ার লোকেরা যে জায়গায় বসে নিজেদের মধ্যে গল্পগুজব করে সেটারই আর অস্তিত্ব রাখা নিষ্প্রয়োজন। কেন? না বুদ্ধবাবুর ব্যাখ্যায়, ‘সাংবাদিকদের জন্য মুখ্যমন্ত্রীর নিরাপত্তা বিঘ্নিত হচ্ছে।

বেমক্কা প্রেস কর্নার ভেঙে মিডিয়ার উপর তাঁর গায়ের জ্বালা মেটালেন বুদ্ধবাবু। ফলস্বরূপ সাংবাদিকদের দুনিয়ায় আরও বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলেন। এই ঘটনার পরে বুদ্ধপন্থী সাংবাদিকেরাও মুখে কুলুপ এঁটে থাকতেন, তাঁর সমর্থনে কোনও কথা বলার সাহস পেতেন না।

গত দশ বছরে যে বাচ্চা ছেলেমেয়েরা মিডিয়ায় ঢুকেছে মহাকরণের অন্দরমহল দেখার সৌভাগ্যই তাদের হয়নি। গঙ্গার পশ্চিম পাড়ে যে আটপৌরে বহুতল ভবনটি এখন রাজ্য প্রশাসনের সদর কার্যালয়, ইতিহাস, স্থাপত্য, আভিজাত্যে মহাকরণের সঙ্গে তার তুলনাই চলে না। স্থানাভাবের কারণে রাজ্য সরকারকে এই সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে, ভবিষ্যতে কোনও দিন সরকারি সদর লালদীঘির পাড়ের ওই অপরূপ সৌধে ফিরবে কি না, সেটাও অনিশ্চিত।

মহাকরণের দোতলায়, সিঁড়ি দিয়ে উঠলে একেবারে উল্টোদিকেই ছিল প্রেস কর্নার। বাঁদিক ধরে এগোলে মুখ্যমন্ত্রীর সচিবালয়, তারপরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, মুখ্যসচিব, স্বরাষ্ট্র সচিব, একেবারে ভিভিআইপি জোন। এমন একটা এলাকায় প্রেস কর্নার করার ভাবনা কার মাথায় এসেছিল বলতে পারব না। যে-ই ভেবে থাকুক, তার সিদ্ধান্ত একেবারেই সমর্থনযোগ্য নয়। আমি ভারতবর্ষের বহু রাজ্যের রাজধানীতে গিয়েছি, কোথাও সদর কার্যালয়ের ভিআইপি জোনে প্রেস কর্নার চোখে পড়েনি। দিল্লিতে বদলি হওয়ার আগে আমি সামান্য কয়েক মাস কলকাতায় রিপোর্টিং করেছিলাম, মহাকরণের ডিউটি পড়ত কদাচিৎ। দু’একবার প্রেস কর্নারে বসেছি, ঠান্ডা ঘর, দেখেছি সিনিয়র সাংবাদিকেরা কেউ কেউ দিব্যি ঘুমোচ্ছেন। একদিন সেখানে স্নেহাংশু আচার্য মহাশয়কে বসে আড্ডা দিতে দেখেছিলাম। পরিচিতরা তাঁকে ‘দোদো’-দা বলে ডাকতেন। জমিদার মানুষ, বড়লোক, জ্যোতিবাবুর হরিহর-আত্মা বন্ধু, স্বভাবে ঠিক বিপরীত। দিলখোলা, রসিক, আড্ডাবাজ। আমি কিছুটা ঘাবড়ে গিয়েছিলাম ওঁর মুখে অনর্গল খিস্তি শুনে। পরে জেনেছিলাম ওটাই স্নেহাংশু আচার্যর কথা বলার স্টাইল, কেউ এ সব গায়ে মাখে না।

আমার কাছে না হলেও মহাকরণ নিয়মিত কভার করা রিপোর্টারদের কাছে প্রেস কর্নার ছিল রীতিমতো আবেগের প্রশ্ন। তার চেয়েও বড় কথা কোনও আগাম নোটিস না দিয়ে যে ভাবে ঘরটি ভেঙে দেওয়া হয়েছিল, তাতে তথ্যমন্ত্রীর প্রতিশোধ-স্পৃহাই যেন বে-আব্রু হয়ে পড়েছিল। একই সিদ্ধান্ত রাজ্য সরকার অন্যভাবে বলবৎ করতে পারতেন। চাইলে সিনিয়র রিপোর্টারদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করতে পারতেন। বাদ সেধেছিল একজন ব্যক্তির ক্ষমতার দম্ভ। বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য। (চলবে)

Leave a comment

Your email address will not be published.