logo

বুদ্ধ ও নির্বাণ (পর্ব-১)

  • August 16th, 2022
Memoir

বুদ্ধ ও নির্বাণ (পর্ব-১)

সুমন চট্টোপাধ্যায়

অনেক বছর আগের কথা। কলকাতার একটি নামজাদা বাণিজ্যিক সংস্থা একবার স্থির করল পুজোর আগে তারা একটি স্মরণিকা প্রকাশ করবে। আমার কাছে অনুরোধ এল কলকাতায় দুর্গাপুজোর ইতিহাস নিয়ে একটি নিবন্ধ লেখার। কোম্পানির তৎকালীন পাবলিক রিলেশনস অফিসার, এখন প্রসিদ্ধ গায়ক, ভ্রাতৃসম শান্তনু রায়চৌধুরী এমন ভাবে পীড়াপীড়ি করতে শুরু করল আমি শত অজুহাত দিয়েও ওকে ফেরাতে পারলাম না। লেখা দিলাম, ছাপা হল। যথারীতি ভুলেও গেলাম।

বেশ দিন কতক পরে শান্তনু প্রায় কাঁপতে কাঁপতে আনন্দবাজারে আমার অফিস ঘরে এল, চোখ-মুখ উত্তেজনায় লাল, মাথার চুল এলোমেলো, দেখে মনে হয় যেন প্রলয় মাথায় করে বয়ে এনেছে। ঢক ঢক করে এক গ্লাস জল খেল, তখনও অবধি মুখে একটিও কথা নেই।

জলের গ্লাস টেবিলে নামিয়ে রেখে শান্তনু এমন একটা প্রশ্ন করে বসল যে আমিও প্রথম চোটে বেশ ঝটকা খেলাম। ‘আচ্ছা দাদা, বুদ্ধদেববাবু যে তোমাকে এতটা অপছন্দ করেন তুমি নিজে সে কথা জানো? অপছন্দ শব্দটি বোধহয় ঠিক হল না, বলতে পারো চরম ঘৃণা করেন।’

বাণিজ্যিক সংস্থার পিআরও, সে এসে হঠাৎ বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের সঙ্গে আমার সম্পর্ক নিয়ে এই সব মন্তব্য করছে কেন, কিছুই বুঝতে পারলাম না। শান্তনুই অবশ্য প্রায় সঙ্গে সঙ্গে রহস্যের কিনারা করে দিল। ওর মুখে কাহিনিটি শুনে আমি যতটা হতভম্ব হলাম, মজা পেলাম তার কিঞ্চিৎ বেশি। কাহিনিটি এই রকম।

বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য তখন রাজ্যের তথ্য ও সংস্কৃতি মন্ত্রী, রাইটার্সে বসেন। তাঁর ঘনিষ্ঠ কাউকে একটা ধরে শান্তনুর কোম্পানি বুদ্ধবাবুকে আর্জি জানায় তিনি যেন ওই স্মরণিকাটি আনুষ্ঠানিক ভাবে প্রকাশ করেন। মন্ত্রীমশাই পরিষ্কার জানিয়ে দেন, তিনি কোথাও যেতে পারবেন না, রাইটার্সে তাঁর ঘরে যদি অনুষ্ঠানটি হয় তাঁর আপত্তি নেই। সময় বরাদ্দ ১০ মিনিট।

সংস্থার কর্তারা তাতেই বেজায় খুশি, বিশেষ করে এই কারণে যে বুদ্ধবাবু তখনও পারতপক্ষে ব্যবসায়ীদের ছায়া মাড়ান না। নির্ধারিত দিনে নির্ধারিত সময়ে শান্তনু ও সেই সংস্থার কয়েকজন কর্তা পৌঁছে যান মন্ত্রীর ঘরে। বুদ্ধবাবু রাংতার মোড়কটি খুলে ফেলে ক্যামেরার সামনে কয়েক সেকেন্ড দাঁড়িয়েই নিজের চেয়ারে বসে বইটি নাড়াচাড়া শুরু করলেন। সূচিপত্রের পাতায় আমার নামটি দেখেই প্রবল উত্তেজিত হয়ে বুদ্ধবাবু শান্তনুদের ভ্যর্ৎসনা শুরু করেন। ‘আপনাদের কাগজে যে সুমন চট্টোপাধ্যায় লিখেছে সে কথা তো আমাকে কেউ জানায়নি। জানলে আমি কিছুতেই এ কাজ করতাম না। আপনাদেরও তো সাহস কম নয়! সব জেনেশুনে আপনারা এই কাণ্ডটি করেছেন।’

শান্তনু আর তার সহকর্মীদের হাঁটু তখন ভয়ে, আতঙ্কে ঠকঠক করে কাঁপতে শুরু করেছে। মন্ত্রীমশাইকে শান্ত করার অভিপ্রায়ে শান্তনু অস্ফুট ভাবে বলে ওঠে, ‘স্যার এটা তো সুমন চট্টোপাধ্যায়ের রাজনৈতিক লেখা নয়, পুজোর ইতিহাস নিয়ে ফিচার।’

আগুনে ঘৃতাহুতি হল। আরও রেগে গিয়ে বুদ্ধবাবু চেঁচিয়ে উঠলেন, ‘সুমন চট্টোপাধ্যায়ের লেখা পড়ে আমায় ইতিহাস শিখতে হবে নাকি? আমার কি এতটা দুর্দিন পড়েছে? ইতিহাসের বই পড়তে হলে আমি অমলেশ ত্রিপাঠি পড়ব, সুশোভন সরকার পড়ব।’

বলেই হাতের পত্রিকাটি বুদ্ধবাবু এক ঝটকায় মেঝের ওপর ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে শান্তনুদের ঘর থেকে বের করে দিলেন। মহাকরণ থেকে বেরিয়েই উদভ্রান্তের মতো হাঁটতে হাঁটতে শান্তনু আনন্দবাজারে আমার কাছে পৌঁছয় অঘটনের বিবরণ দিতে। আর এই রহস্যের কিনারা করতে যে আমার নাম শুনেই বুদ্ধবাবু এমন তেলে-বেগুনে জ্বলে উঠলেন কেন।

শান্তনুর কাহিনি শুনতে শুনতে একটিই ছোট প্রশ্ন মনে ঊঁকি দিচ্ছিল। আজ বাদে কাল যে ভদ্রলোক রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী হতে চলেছেন, আমার মতো একজন সামান্য সংবাদের কারবারিকে তিনি এতটা গুরুত্ব দিচ্ছেন কেন? এমন আচরণ কি রাজ্যের ভাবী মুখ্যমন্ত্রীর কাছে প্রত্যাশিত? তখনও পর্যন্ত বুদ্ধবাবুর সঙ্গে আমার আলাপ পরিচয় হয়নি, যদিও তাঁর ক্রোধ এবং ঔদ্ধত্য দু’টোই যে মাত্রাছাড়া তার পরিচয় সবাই পেয়ে গিয়েছে। কেন জানি না, কাহিনিটি শোনার পরে মনে হল, নিজের পিঠ নিজেই চাপড়ে দিই। আমার নাম শুনলেই এত বড় একজন নেতার যদি রক্তের চাপ হু হু করে বেড়ে যায় তাহলে বোধহয় আমি ঠিক লাইনেই চলছি।

ঔদ্ধত্য বস্তুটাই সর্বনাশা, খাল কেটে কুমীর ডেকে আনার মতো। বিশেষ করে যাঁরা রাজনীতির মানুষ, আম-জনতার সঙ্গে নিত্য কারবার তাঁদের তো যে কোনও মূল্যে ঔদ্ধত্য অথবা উন্নাসিকতা পরিহার করে চলতেই হবে। তুলনা টেনে জ্যোতি বসুর কথাই ধরা যাক। তিনিও নিজেকে মিডিয়া থেকে শতহস্ত দূরে রাখতেন আবার প্রয়োজনে কী ভাবে মিডিয়াকে ব্যবহার করতে হয় সেটাও জানতেন। কুশলী রাজনীতিকের সঙ্গে ইম্পালসিভ রাজনীতিকের মূল পার্থক্যটাই এখানে। আমি নিজে অনেক রাতে ইন্দিরা ভবনে জ্যোতিবাবুকে ফোন করেছি, হয় কোনও খবর কনফার্ম করতে অথবা কোনও খবর সম্পর্কে তাঁর প্রতিক্রিয়া জানতে। তিনি ফোন ধরতেন, স্বভাবসুলভ নিরাসক্ত গলায় কাটা কাটা জবাব দিতেন, অপমানিত বোধ করার কারণই থাকত না। বুদ্ধদেববাবুর পাম অ্যাভিন্যুর বাড়িতে এই ভাবে ফোন করার কথা কোনও রিপোর্টার কল্পনাই করতে পারত না।

বর্তমান প্রকাশ করার পরে বরুণ সেনগুপ্ত রোজ জ্যোতিবাবু আর পুত্র চন্দনকে গালাগালি করতেন, দুর্নীতির অভিযোগও তুলতেন বারেবারে। কিন্তু জ্যোতিবাবু একটিবারের জন্য এমনকি অস্ফুট ভাবেও কোনও প্রতিবাদ জানাননি, মামলা-টামলা করার কথা তো দূরস্থান। ক্ষেত্র বিশেষে স্রেফ অবজ্ঞাই যে লড়াই অথবা অপমানের চেয়ে কার্যকর অস্ত্র হয়ে উঠতে পারে, ইচ্ছে করলে বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য তা পিতৃসম মুখ্যমন্ত্রীর কাছে শিখে নিলে পারতেন। আমার মনে হয় সেখানেও বাদ সেধেছে তাঁর ইগো।

বর্তমান সম্পর্কে জ্যোতিবাবুর সচেতন নীরবতার পাশে একবার বুদ্ধদেবের ক্ষোভ উদ্গীরণের ঘটনা মনে করা যাক। নন্দীগ্রামে তথাকথিত সূর্যোদয়ের পরে মহাকারণে সাংবাদিক বৈঠক ডেকেছিলেন তিনি। বর্তমানের প্রতিনিধি, পরে এই সময়ে আমার সহকর্মী অমল সরকার মুখ্যমন্ত্রীকে একটি অস্বস্তিকর প্রশ্ন করে বসেন। রাগে দিকবিদিকজ্ঞানশূন্য হয়ে অমলকে তিনি পাল্টা প্রশ্ন করেন, ‘আপনি কোন কাগজের?’

বর্তমান।

আপনার কোনও প্রশ্নের আমি উত্তর দেব না। আপনাদের কাগজকে আমি ঘৃণা করি।
একটা সময় ছিল যখন বুদ্ধদেববাবুর অপছন্দের মানুষের তালিকা একত্র করলে সাবেক টেলিফোন ডিরেক্টরির মতো হৃষ্টপুষ্ট একটা বই হতে পারত? আর পছন্দের তালিকা ছিল মিনি-বুক। (চলবে)

Leave a comment

Your email address will not be published.