logo

ওরে বাবা ব্রাজিল!

  • November 25th, 2022
Suman Nama

ওরে বাবা ব্রাজিল!

সুমন চট্টোপাধ্যায়

ব্রাজিল! নামটা শুনলে, ২৮ বছর পরে এখনও আমি মাঝেমাঝেই আঁতকে উঠি, মনটা ভারী হয়ে ওঠে, নিজের অবিমৃষ্যকারিতার কথা স্মরণ করে অন্তর গ্লানিবিদ্ধ হয়, নিঃশব্দ অপরাধবোধে অবশ হই।

আমার জীবনে গিন্নির সঙ্গে সত্যিকারের বিচ্ছেদের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল ১৯৯৪ সালের জুলাই-আগস্ট মাসে। হতচ্ছাড়া ওই ব্রাজিলিয়ান সমর্থকদের জন্যই। শেষ পর্যন্ত দাম্পত্য যে ক্ষতচিহ্ন নিয়ে অক্ষত থেকে গেল তা একমাত্র কস্তুরীর মহানুভবতার কারণে। সে সময় ও বাইরে বের হওয়ার দরজা দেখিয়ে দিলে আমার কিছুই করার ছিলনা।

পাজির পাঝাড়া ব্রাজিলিয়ানরা করেছিলটা কী? আমাদের দাম্পত্যে এত লোক থাকতে খেয়ে দেয়ে কম্মো নেই আর একটা হেমিসফিয়ারের বাসিন্দাদের ছায়া পড়েছিল কীভাবে? কী করে সেটা সম্ভব? হয়ত আপনারা ভাবছেন আমি ফাজলামি করতে বসেছি, ব্রজদা-ঘনাদা-টেনিদার স্টাইলে গুল্প শুনিয়ে আপনাদের মুর্গি বানাচ্ছি! না তা করছিনা, রহস্যটাকে আরও ঘন করে তুলব বলে গৌরচন্দ্রিকাটি কিঞ্চিৎ দীর্ঘায়িত করছি মাত্র। রহস্য-ভেদ তো হবেই, তার আগে পিকচার আভি বাকি হ্যায় দোস্ত। Fasten your seat belt for take off,

আমি আর পাঁচজন খাঁটি বাঙালির মতো আশৈশব ফুটবলপ্রেমী, খেলে ততটা সুবিধে করতে পারিনি যতটা আনন্দ পেয়েছি গ্যালারিতে বসে। ইস্কুলে নাইন থেকে ইলেভেন এই তিন বছর ময়দানে ইস্টবেঙ্গলের একটি ম্যাচও ছাড়ান দিইনি, পঁয়ষট্টি পয়সার লাইনে ধস্তাধস্তি, ইতস্তত মারপিঠ করতে গিয়ে মাউন্টেড পুলিশের লাঠির বাড়িও পিঠে এসে পড়েছে বেশ কয়েকবার। প্রতিশোধ নিতে ঘোড়ার পিছনে দাঁড়িয়ে জ্বলন্ত সিগারেটের ছ্যাঁকাও লাগিয়েছি বেচারার অন্ডকোষে, তার লাফানিতে ঘোড়সওয়ারের ত্রাহি মধুসূদন অবস্থা হতে দেখে দূর থেকে দাঁড়িয়ে আমোদও পেয়েছি বিস্তর। তখন ক্লাবের কার্ডওয়ালা সদস্যদের দেখলে বেদম ঈর্ষা হোত, এক টাকা দশ পয়সা দিয়ে টিকিট কাটার সামর্থ্যও ছিলনা। বাসে যাতায়াত করতাম ঝুলতে ঝুলতে, কন্ডাক্টর যাতে টিকিটের পয়সা না চাইতে পারে, তাকে ফাঁকি দিতে ক্রমাগত সামনে- পিছনে করতাম, কোনও দরজায় দু’টি স্টপেজের বেশি ঝোলাটা ছিল বেশ ঝুঁকিপূর্ণ।সেই সময়টা ছিল লাল-হলুদের স্বর্ণযুগ, অশ্বমেধের ঘোডার মতো অপ্রতিরোধ্য।সুধীর কর্মকার ছিল আমার কৈশোরের হিরো, গৌতম-সুভাষ-সুরজিতের স্থান ঠিক তারপরেই। মোহনবাগান যে ম্যাচে পাঁচটা গোল খেল, গ্যালারিতে বসে সেদিন মনে হয়েছিল, মোক্ষলাভ হয়ে গিয়েছে, এরপরে মরে গেলেও কোনও দুঃখ নেই। গোল লাইনে খাবি খাওয়া ভাস্কর গাঙ্গুলির বেদনাবিধুর মুখটা আমার স্মৃতিতে অমলিন হয়ে আছে আজও।

তারপর জীবন চলিয়া গেছে কুড়ি কুড়ি বছরের পার, ময়দানের সঙ্গে চির-বিচ্ছেদ ঘটে গিয়েছে বলা যায়। দিল্লিতে থাকতে ডুরান্ড কাপে ইস্টবেঙ্গলের কয়েকটা খেলা দেখেছি বটে, নিছকই দুধের স্বাদ ঘোলে মেটানো। আমার কর্মস্থল আনন্দবাজার ছিল মোহনবাগানিদের ঘাঁটি, মালিক থেকে চাপরাশি প্রায় সবাই সবুজ মেরুন। ওই শত্রুপুরীতে বসে ইস্টবেঙ্গল জিতেছে খবর পেলে আনন্দ পেয়েছি, চারপাশের ঘটি উল্লাস শুনে বুঝতে পেরেছি জিতেছে মোহনবাগান। কখন অলক্ষ্যে একদিন উপলব্ধি করলাম আমার অবনমন হয়ে গিয়েছে, উগ্র ভক্ত থেকে পর্যবসিত হয়েছি নীরব সমর্থকে।

তিরানব্বইয়ের সেপ্টেম্বরে সম্পাদকের এস ও এস পেয়ে কলকাতায় ফিরলাম আনন্দবাজারের বার্তা বিভাগের দায়িত্ব নিয়ে। ফুটবলের দিকে বিশেষ নজর দেওয়ার ফুরসৎই ছিলনা, কাগজের প্রচার-প্রসারই তখন আমার অষ্টপ্রহরের ধ্যানজ্ঞান। চুরানব্বইয়ের গ্রীষ্মে কোনও একটি দিন আমার বাড়িতে আড্ডা দিতে এসে প্রিয়দা প্রস্তাব দিল, ওয়ার্লড কাপ দেখতে যাবি? যাতায়াত, হোটেল, খাওয়া দাওয়ার খরচা তোর, আমি কেবল ভাল জায়গায় বসে খেলা দেখার ভি আই পি পাস দিতে পারি। হতভম্বের মতো কয়েক মুহূর্ত স্পিকটি নট হয়ে বসে থাকলাম, মনে হোল কোনও দেবদূত যেন কানের গোড়ায় এসে ফিশফিশ করে বলে গেল, চল চাঁদে যাই। সেদিনই অভীকবাবুকে জানালাম প্রিয়দা’র প্রস্তাব, তিনি হাসতে হাসতে এক কথায় সম্মতি দিয়ে বললেন,’ ভালই হবে। রূপক (সাহা) ফুটবল নিয়ে লিখুক, কুমি কালার স্টোরি পাঠিও।’

সে রাতে বাড়ি ফিরলাম পানশালার ডাক উপেক্ষা করেই। খবরটা কস্তুরীকে কীভাবে দেব, দিলে ওর প্রতিক্রিয়া কী হবে বুঝতে পারছিলামনা, কেননা এমন কঠিন ধর্মসঙ্কটে আমি এর আগে কখনও পড়িনি। দিল্লিতে কর্মরত অবস্থায় সারাক্ষণ দেশ-বিদেশে চর্কি কেটে বেড়িয়েছি, কোনও দিন গিন্নির মতামতের তোয়াক্কাও করিনি। কিন্তু এবার পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন। অচিরেই আবার মা হবে সে, ঠিক কবে হতে পারে ডাক্তার তা নিশ্চিত করে তখনও বলেননি। বিশ্বকাপের চুম্বক যদি এক পা এগোতে সাহায্য করে, আসন্ন সন্তানের মুখ তাহলে পিছনে টান দেয়! এক্কেবারে ক্যাচ টুয়েন্টি-টু সিচুয়েশন।

গিন্নি খবরটা শুনে কোনও মন্তব্য করলনা, আয়ত দু’টি চোখের কোণা দিয়ে এমনভাবে তাকাল যে আমি ওর মনের কথাটা স্পষ্ট বুঝতে পারলাম। সে রাতে আর কথা না বাড়িয়ে পরের দিন সকালেই ছুটলাম ডাক্তারের চেম্বারে, জুলাইয়ের অমুক তারিখ থেকে অমুখ তারিখের মধ্যে ডেলিভারির সম্ভাবনা কতটা, খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে জানতে চাইলাম। সল্টলেক নিবাসী সেই প্রবীণ, সদা হাসিমুখ, অতি সজ্জন ডাক্তারবাবুর নামটি এত বছর পরে আর মনে পড়ছেনা কিন্তু তাঁর কুছ পরোয়া নেই গোছের নিদানটি আছে। বিশ্বকাপ দেখতে যাব শুনে ডাক্তারবাবু নিজেই খুব উত্তেজিত হয়ে আমাকে উৎসাহিত করে বললেন, ‘ ইয়ং ম্যান, এমন সুযোগ কেউ হাতছাড়া করে নাকি? আমি বলছি, আগস্টের প্রথম সপ্তাহের আগে আপনার সন্তান ধরাধামে অবতীর্ণ হবেননা। আপনি নিশ্চিন্ত হয়ে যান।

এরপর আর গিন্নির বিহ্বলতাকে প্রশ্রয় দিতে পারলামনা। বালুরঘাট থেকে আমার শ্বশুর-শাশুড়িকে জরুরি তলব দিয়ে কলকাতায় নিয়ে এলাম, যেখানে যাকে যা বলার সব্বাইকে সতর্ক করে রাখলাম। নির্ধারিত দিনে নির্দিষ্ট সময়ে সপত্নীক প্রিয়দা এলেন, গাড়ির হর্ণ শুনে, গোছানো ব্যাগ নিয়ে আমি দরজা খুললাম। ঘুরে তাকিয়ে দেখি কস্তুরীর ঠোঁটে অতি কষ্টার্জিত এক চিলতে বাঁকা হাসি, দু’চোখ জলে ছলছল।

মনটা হু হু করে উঠল।তখন ফেরার আর উপায় নেই। জয় মা বলে উঠে পড়লাম প্রিয়দার গাড়িতে। এয়ারপোর্টে যাওয়ার পথে দীপা ক্ষতে নুনের ছিটে ছড়িয়ে গিল কয়েক ছটাক। ‘কস্তুরীকে এই অবস্থায় রেখে তোমার কিন্তু অত দূরে যাওয়াটা ঠিক হচ্ছেনা।’ আমি মাথা নীচু করে চুপচাপ শুনে গেলাম। একবার মনে হোল প্রিয়দাকে বলি, গাড়ি থামাও, আমি বাড়ি ফিরে যাই। কিন্তু মুখ ফুটে বলতে পারলামনা। আমাকে তখন নিশির ডাক হয়ে টানছে লস এঞ্জেলেস! (চলবে)

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *