logo

অভীক ছাড়া আনন্দবাজার হয় না

  • August 13th, 2022
Suman Nama

অভীক ছাড়া আনন্দবাজার হয় না

সুমন চট্টোপাধ্যায়

আজ দোল পূর্নিমার সকালে শতায়ু আনন্দবাজার রোজকার মতো প্রকাশিত হয়েছে অথচ প্রিন্টার্স লাইনে সম্পাদক হিসেবে অভীক সরকারের নাম নেই। আমি আজ সাদাবাড়ির কেউ নই, চাকরি ছেড়েছি তাও দেড় দশক হয়ে গেল, তবু কথাটা ভেবেই বুকের ভিতরটা মোচড় দিয়ে উঠল। সাবেক আনন্দবাজারে যাঁরা কাজ করতেন, প্রতিষ্ঠানের প্রতি দারুন আনুগত্য ছিল তাঁদের, একবার ঢুকলে রিটায়ার করার আগে পর্যন্ত ছেড়ে যাওয়ার প্রশ্ন ছিল না। সরকার বাড়ির চাকরি ছিল রাজ্য অথবা কেন্দ্রীয় সরকারের চাকরির মতোই নিরাপদ। কর্মীদের এমন আশ্চর্য ভালোবাসা আর আনুগত্য নিয়ে কোথাও আলোচনা হতে দেখি না, যদিও আনন্দবাজারের সাফল্যের এটিও ছিল একটি বড় কারণ।

আনন্দবাজারে আজ মহোৎসবের প্রহর কিন্তু  হাওয়ায় কি স্বতঃস্ফূর্ত আনন্দ-উচ্ছ্বাসের কোনও ছোঁয়া আছে? কর্মীদের মনে আছে বসন্ত-হিল্লোল? থাকা সম্ভব? যে বাজারে রাজা স্বয়ং সিংহাসনচ্যুত হন গায়ের জোরে, তাঁকে সম্পূর্ণ ঊলঙ্গ করে নির্বাসনে পাঠিয়ে দেওয়া হয় সেটা আর যাই হোক আনন্দের বাজার হতে পারে না। অনেকবার ভেবেছি, কী ভাবে ব্যাখ্যা করা উচিত এমন আপাত-অসম্ভব, মর্মভেদী ট্র্যাজেডিকে? শতবর্ষের সেরা লজ্জা? ক্ষমার অযোগ্য অপরাধ? নাকি কৃষ্ণ বিহনে গোকুল অন্ধকার?

সেই ২০০৫ সালের পয়লা অক্টোবর স্টার আনন্দ ছেড়ে বেরিয়ে আসার পরে অভীকবাবুর সঙ্গে আমার আর দেখাই হয়নি। মাঝে মাঝে মনে হয় বালিগঞ্জ পার্ক রোডের ওই সুন্দর, ছিমছাম কোনার বাংলো বাড়িটির কলিং বেলটা একবার টিপে দেখলে কেমন হয়। সবচেয়ে খারাপ হলে কী হবে, অভীকবাবু দেখা করতে রাজি হবেন না। আমার তাতে কোনও লোকসান নেই বরং অন্তরাত্মা তৃপ্ত হবে এ কথা ভেবে যে আমি কিন্তু ভাঙা সেতুটি পার হওয়ার চেষ্টা করেছিলাম।

আমি যে অভীক সরকারকে চিনি তিনি স্বভাবে একই রকম থাকলে আমার সঙ্গে আলবাৎ দেখা করতেন এবং পুরোনো প্রসঙ্গের অবতারণাই করতেন না। সবার ঊর্ধ্বে অভীকবাবু প্রায় বিলুপ্ত বাঙালি ভদ্রলোক প্রজাতির এক গর্বিত প্রতিনিধি, শিক্ষা-সংস্কৃতিতে আকণ্ঠ নিমজ্জিত, আদৌ প্রতিহিংসাপরায়ণ নন, অতিথি বৎসল, কেচ্ছায় সাঙ্ঘাতিক উৎসাহ, স্বভাব আড্ডাবাজ। এত বছর পরে আমাকে দেখলে প্রথম চোটে তিনি হয়তো চিনে উঠতে না-ও পারেন, তবে মুখের ওপর দরজা বন্ধ করবেন না। কেন না সেটা অভীক সরকারের ডিএনএ-তেই নেই।

আমার নিজস্ব ধারণা ছিল আনন্দবাজার শতবর্ষের চৌকাঠ পার হলে অভীকবাবু সম্পাদনার ব্যাটন তুলে দেবেন পরের প্রজন্মের হাতে। তাঁর দুই কন্যার মধ্যে কেউ সম্পাদক হবেন না, এটা পূর্ব-নির্দিষ্ট ছিল, তাতে ব্যত্যয় ঘটার কোনও সম্ভাবনাই ছিল না। অনিবার্য ভাবে সম্পাদনার দায়িত্ব আসত ভ্রাতুষ্পুত্রের হাতে। সংযম আর শৃঙ্খলার মধ্যে জীবনটাকে বেধে ফেলতে পেরেছেন বলে এখনও তিনি শারীরিক ভাবে ফিট, ৭৮ বছর বয়সেও নিয়মিত গল্ফ খেলেন। অভীক সরকার আজও কোনও অশক্ত বৃদ্ধের নাম নয়, মনে তিনি এখনও তরুণ। শতবর্ষের দিনটি পর্যন্ত সম্পাদকের চেয়ারে তাঁকে বসতে দেওয়া উচিত ছিল, সম্পাদক হিসেবে এদিন নিশ্চয় তিনি এমন নাটকীয় কিছু করে বসতেন যা দেখে চোখ ধাঁধিয়ে যেত। সেটাই হতো তাঁর মহানায়োকচিত বিদায়ের শেষ পদ-চিহ্ন। হতো আনন্দবাজার পরিচালনার সফলতম পর্বের সমাপন, মধুরেণ সমাপয়েৎ। তার বদলে এক অনভিজ্ঞ যুবাকে মসনদে বসিয়ে পিছন থেকে রাজ্য শাসন করছেন উদ্ধত, অহংকারী প্রতিহিংসা পরায়ণ এক, বৈরাম খান যিনি কলম নয় কেবল তরোয়াল চালাতে জানেন।

অথচ গৃহের অন্দরের অতর্কিত অভ্যুত্থান এক সকালে অভীক সরকারকে স্রেফ ‘নো-বডি’-তে পর্যবসিত করল, নিজের অফিসে অকস্মাৎ তিনি অচ্ছুত হয়ে গেলেন, গোটা অফিসে এমন ভয়ঙ্কর ভয়ের বাতাবরণ সৃষ্টি করা হল যাতে অভীকবাবুর কাছের সহকর্মীরাও চাকরি বাঁচানোর তাগিদে তাঁকে পরিত্যাগ করলেন। হিন্দু বাঙালি পরিবারে এমন অভ্যুত্থান দেখা যায় না, মারোয়াড়ি পরিবারেও নয়। আনন্দবাজারের অভ্যুত্থান আমাকে অনেক বেশি মোগল আমলের কথা মনে করাল যখন ভায়ে-ভায়ে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ প্রায় নিয়মে পর্যবসিত হয়েছিল। অভীকবাবুর ক্ষেত্রে একমাত্র ব্যতিক্রমী ঘটনা হল, শাহজাহানের মতো কেউ তাঁকে বন্দি করেনি, তাঁর পায়ে ভারী শিকলও লাগায়নি কেউ। ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার বার্তা কানে আসার মুহূর্তে অভীকবাবুর ঠিক কী মনে হয়েছিল, জানতে ইচ্ছা করে। নাটুকেপনা করার মানুষ অভীকবাবু কখনও ছিলেন না। তবু জানতে ইচ্ছে হয়, তাঁর চোখের কোনে এক ফোঁটা জল কি টলটল করে উঠেছিল! এ তো সেই আজ রাজা কাল সে ফকিরের গপ্পো নয়, তার চেয়েও অনেক মর্মান্তিক, অনেক হৃদয়-বিদারক। সব আছে কিন্তু কিচ্ছু নেই, একটু আগে পর্যন্ত ছিল, এখন ভো-কাট্টা।

অভীক সরকার সম্পর্কে এমন সশ্রদ্ধ স্মৃতিচারণের কোনও প্রয়োজন আমার ছিল না, কেন না তাঁর অপমানের ঠেলায় অতিষ্ঠ হয়েই আমি আনন্দবাজার গোষ্ঠী ছাড়তে বাধ্য হয়েছিলাম। অফিসের বাইরে আমার কয়েক জন বন্ধুর কাছেও তিনি আমার নামে শেষের দিকে কুৎসা শুরু করেছিলেন। বন্ধুরাই আমাকে সে সব কথা জানিয়ে দিত। সবচেয়ে বড় কথা আনন্দবাজার এবং স্টারের মতো ব্র্যান্ডকে ছেড়ে ছেলেমেয়েরা পিলপিল করে ইস্তফা দিয়ে চলে যেতে পারে, টাকা, প্রমোশন কোনও কিছুর টোপই যে তাঁদের নিরস্ত করতে পারে না, এমনকী অজানা অনিশ্চিত ভবিষ্যতও নয়, আমি সেটা প্রমাণ করে দিয়েছিলাম। শতবর্ষের ইতিহাসে আনন্দবাজার গোষ্ঠীর চাকরি ছেড়েছেন শয়ে শয়ে সাংবাদিক। একমাত্র আমিই ঢাল নেই তরোয়াল নেই নিধিরাম সর্দার হয়ে দাঁড়িয়ে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়েছিলাম প্রতিষ্ঠিত সত্যের বিরুদ্ধে। অন্তত একটিবারের জন্য হলেও প্রমাণিত হয়েছিল ব্র্যান্ড নয় ব্যক্তিই বড়। সেই থেকে আমি পার্সোনা নন গ্রাটা, আমার ওপর পত্রিকার মালিকদের এখন দুর্বাশা-সুলভ রাগ।

আমি মনে করি অভীকবাবুর সঙ্গে আমার সামগ্রিক সম্পর্কের প্রেক্ষাপটে এই ছোট্ট, তিক্ত পর্বটি অতি অকিঞ্চিৎকর, যাকে প্রাপ্যের গুরুত্ব দেওয়ার কোনও মানে হয় না। এই সম্পর্কের বৃহত্তম সত্যটা হল, অভীক সরকার না থাকলে এই হতভাগ্য ব্রাহ্মণ সন্তানের নাম তার প্রতিবেশী ছাড়া আর বিশেষ কেউ জানত বলে মনে হয় না। কুমোর যে ভাবে ধীরে ধীরে একটি বাঁশের কাঠামো আর দলা-পাকানো খড়-বিচুলি দিয়ে শুরু করে মূর্তি নির্মাণ করে অভীক সরকার আমার ক্ষেত্রে ঠিক সেটাই করেছিলেন। এই যে দেশে বিদেশে লাগাতার ছক্কা হাঁকিয়ে রিপোর্টারি করেছি তা আমার সম্পাদক সুযোগ দিয়েছিলেন বলেই সম্ভব হয়েছিল। তারপরে অকস্মাৎ তাঁর যখন মনে হল ধুঁকতে থাকা আনন্দবাজারে কিছুটা প্রাণের স্পন্দন আমি ফিরিয়ে আনতে পারি এবং সে জন্য সাধের রিপোর্টারি ছেড়ে নিউজরুমে মাস্টারি করতে হবে আমি এক কথায় রাজি হয়েছিলাম। দুই দশকের বেশি সময় ধরে আমি ছিলাম তাঁর ‘অল্টার ইগো’, অনেক ক্ষেত্রে তাঁর ছায়াও।

আমার প্রতিপালক তো তিনি ছিলেনই, সেটা আমার জীবনে সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি। একই সঙ্গে গত অর্ধশতকে অভীক সরকারই এদেশের সেরা সম্পাদক, সম্ভবত শেষ সম্পাদকও। তাঁর স্পষ্ট দু’টি সত্ত্বা ছিল, মালিক এবং সাংবাদিক। অভীকবাবু তাঁর নিজের দীর্ঘ কর্মজীবনটি ব্যয় করেছেন সাংবাদিকতার সাধনায়, মালিকানায় কেবল বুড়ি ছোঁয়ার মতো। হতে পারে ব্যবসা ও মালিকানার প্রশ্নে সম্পূর্ণ অমনযোগী হওয়ার কারণেই অন্তরালে যে ষড়যন্ত্র দানা বাঁধছে সেটা তিনি টেরই পাননি। কেন তাঁকে সেরা সম্পাদক বলছি, এখানে বিস্তারিতে তা আলোচনা করছি না, পরে কখনও করা যাবে। অভীকবাবু প্রায় কোনও বিষয়েই চলতি হাওয়ার পন্থী হওয়ার পাত্র ছিলেন না, ভিন্ন, বিষয় বিশেষে তীর্যক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে বিষয়ের পর্যালোচনা করতেন এবং সহকর্মীদের মধ্যে তা সঞ্চারিত করারও চেষ্টা করতেন। সম্পাদক ঠিক কী বলতে চাইছেন সেটা বুঝে আত্মস্থ করতে পারাটাই ছিল একটা চ্যালেঞ্জ। বাংলা কাগজের সম্পাদনা করছেন বলে তাঁর মধ্যে আমি কোনও দিন হীনমন্যতা বোধ দেখিনি। বরং আমাকে তিনি প্রায়শই বলতেন, আসল কথাটি হল বেঞ্চমার্কিং। ধর ক্রিকেট খেলতে নেমে আমায় নিজেকে একজনের সঙ্গেই তুলনা করতে হবে। শচীন তেন্ডুলকর। শচীনের চেয়ে আমি কতটা ভালো, কতটা খারাপ, তা না করে আমি যদি সম্বরণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে নিজের তুলনা করি তাহলে কিছুতেই এক্সেলেন্সের ধারে কাছ যেতে পারব না। অভীকবাবুর যে উক্তিটি আমাকে বিশেষ অনুপ্রাণিত করত তা হল, 'মনে রাখবে হোয়াটএভার ইজ পসিবল ইন ইংলিশ ইজ অলসো পসিবল ইন বেঙ্গলি।’ আমিও সহকর্মীদের গা গরম করাতে বারেবারে এই কথাটি বলতাম।

স্তালিনের মৃত্যুর পরে সোভিয়েত ইউনিয়নে শুরু হয়েছিল ‘ডি-স্তালিনাইজেশন’। স্তালিনের জমানার যা কিছু বাড়াবাড়ি তা বন্ধ করে দেওয়া। অভীক সরকার এখনও জীবিত, বয়সের তুলনায় শরীর-স্বাস্থ্যও চমৎকার। কিন্তু তাতে কী! বৈরাম খান ফতোয়া জারি করে দিয়েছেন আনন্দবাজারের শতবর্ষ উপলক্ষ্যে যত লেখা ছাপা হবে বা অনুষ্ঠানাদি হবে তার কোনও কিছুতেই অভীকবাবুর নাম থাকা চলবে না। যে মানুষটি ১০০ বছরের মধ্যে অর্ধেকটা সময় আনন্দবাজারের নিউজ রুমে দাঁড়িয়ে কাগজটি পরিচালনা করলেন তাঁকে এ ভাবে বাদ দেওয়া যায়? অসূয়াক্রান্ত সিদ্ধান্তে বদলে যেতে পারে একজন মানুষের এমন অবিস্মরণীয় অবদান? এ তো অনেকটা এলাহাবাদকে প্রয়াগরাজ করার মানসিকতাই। ভারতের ইতিহাস থেকে মোগল আমলকে ভুলিয়ে দেওয়ার চেষ্টা।স্বস্তির কথাটি হল দু’চার পিস বৈরাম খানের কম্মো নয় ইতিহাসকে অবলুপ্ত করে। আজ তাই দ্ব্যর্থহীন ভাবে এ কথা বলার সময় এসেছে যে অভীক সরকার ছাড়া আনন্দবাজারই হয় না।

শতবর্ষে এটাই হোক আনন্দবাজারি স্লোগান।

Leave a comment

Your email address will not be published.