logo

আলবেয়ার কামু আর মহামারি

  • August 12th, 2022
Suman Nama, Troubledtimes

আলবেয়ার কামু আর মহামারি

আলবেয়ার কামু আর মহামারি

সুমন চট্টোপাধ্যায়

ইতিহাসে যুদ্ধ যতবার হয়েছে, মহামারিও হয়েছে ততবারই। তবু এই দু’য়ের একটা যখনই ঘটে, আমরা অবধারিতভাবে বিস্মিত হই।

কথাগুলো আমার নয়, আলবেয়ার কামুর (রাজীব গান্ধি একবার কোনও একটা আন্তর্জাতিক মঞ্চে যাঁকে অ্যালবার্ট ক্যামাস বলে উচ্চারণ করে মিডিয়ায় বিস্তর প্যাঁক খেয়েছিলেন), লিখেছিলেন ‘দ্য প্লেগ’ উপন্যাসে। পন্ডিতদের অনেকেই বলে থাকেন বিংশ শতকের সেরা ইউরোপীয় উপন্যাসের তালিকায় অনিবার্যভাবে রাখতে হবে এই বইটিকে, সে আপনি মার্কসবাদী হোন আর নাই হোন। হক কথা, প্রশ্ন তোলার কোনও অবকাশই নেই।

সত্তরের দশকে আমরা যখন কলেজের ছাত্র, কাফকা-কামু-সাত্রে পড়া না থাকলে তাকে মানুষ বলেই গন্য করা হতনা।আঁতেলদের আড্ডায় জায়গা পাওয়ার তো কোনও প্রশ্নই নেই। তখনই প্রথম পড়েছিলাম ‘ দ্য প্লেগ’ উপন্যাসটি।তার বছর পঁয়তাল্লিশ পরে আর এক মহামারির সময়ে কয়েদবাসের মধ্যে আবার পড়লাম। একবার নয়, পরপর দু’বার।তারপর থেকে মনটা শান্ত হয়ে গিয়েছে, জীবনের চরমতম দুর্বিপাকে বেঁচে থাকার সারমর্মটি কামুর সৌজন্যে নতুন করে আরও একবার বুঝে নেওয়ার পরে। আপনারাও কেউ কেউ নিশ্চয়ই বইটি পড়েছেন, না পড়ে থাকলে আমার সানুনয় সুপারিশ হল আবার পড়ুন। যাঁরা পড়েননি, তাঁরা তো অবশ্যই পড়ুন। করোনা-ক্লিষ্ট, অবরুদ্ধ জীবনে, এর চেয়ে ভাল মনের স্যানিটাইজার আর পাবেননা, এটুকু আমি হলফ করে বলতে পারি।

বিষয় হিসেবে মৃত্যু ছিল কামুর বড্ড প্রিয়, ফলে নিজস্ব লেখালেখিতে তিনি যতটা মৃত্যুর সঙ্গে সহবাস করেছেন, সম্ভবত দ্বিতীয় কোনও ঔপন্যাসিক তা করেননি। মৃত্যু প্রভাব ফেলেছিল তাঁর ব্যক্তিগত জীবন-চর্চাতেও, নইলে কি কেউ সাধ করে নিজের দুই পুত্র-কন্যার ডাক-নাম মজা করেও ‘প্লেগ’ আর ‘কলেরা’ রাখতে পারেন? কামুর সন্তানেরা এখনও জীবিত, প্লেগ অথবা কলেরা কোনও কিছুই তাঁদের স্পর্শ করতে পারেনি। কাগজে পড়ছি, করোনার সৌজন্যে এই উপন্যাসটির চাহিদা হঠাৎ করে এমন বেড়ে গিয়েছে যে প্রকাশকেরা বইটির জোগান দিতে হিমসিম খাচ্ছেন।নতুন করে কামুর খোঁজ পড়েছে গোটা ইউরোপ জুড়েই। লেখকের জীবনে এমনটা হয়েই থাকে সময়ে সময়ে, বিশেষ পরিপ্রেক্ষিতে নতুন করে বেঁচে ওঠেন বিস্মৃত কোনও লেখক, হঠাৎ করে তাঁর প্রাসঙ্গিকতা ফিরে আসে। অবশ্য এই নিয়ম একমাত্র কালোত্তীর্ণ মহৎ সাহিত্য-সৃষ্টির ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য যার মধ্যে কামুর ‘দ্য প্লেগ’-কে স্থান দিতে হবে একেবারে ওপরের দিকে।

এই উপন্যাসটি লেখার আগে কামু অতীতের মহামারিগুলি সম্পর্কে নিবিষ্ট গবেষণা করেছিলেন।করোনার বৈশিষ্ট্য এই মহামারি ছায়াপাত করেছে বিশ্বের মানচিত্রের প্রতিটি মহাদেশের ওপরে, কাউকে সে রেয়াৎ করছেনা, এমনটি এর আগে আর কখনও হয়নি।কিন্তু মৃত্যুর মিছিল যদি কোনও মানদন্ড হয় করোনা তাহলে ইউরোপের বিউবোনিক প্লেগ, স্প্যানিশ ফ্লু অথবা বিলেতের ব্ল্যাক ফিভারের কাছেকরোনা নেহাতই শিশু। গোটা বিশ্বে এখনও পর্যন্ত মৃতের সংখ্যা দু’লাখ ছুঁয়েছে করোনার কারণে।অথচ ইউরোপ অতীতে এমন মহামারি দেখেছে যাতে পাঁচ কোটি মানুষ সাফা হয়ে গিয়েছিল।সেই মহামারি ছিল পরমাণু বোমা, করোনা তার পাশে বড় জোর অ্যাসল্ট রাইফেলের চেয়ে বেশি কিছু নয়।এই ভাইরাসের চেহারায় কাঁটা আছে ছবিতে দেখতে পাচ্ছি, কিন্তু দংশন আদৌ ততটা বিষাক্ত নয়।সবার ওপরে সারকথাটি হল বিজ্ঞানের গতি যত অপ্রতিরোধ্যই হোক না কেন মহামারির সম্ভাবনাকে সম্পূর্ণ নির্মূল করার ক্ষমতা অমিত শক্তিধর মানুষেরও নেই। মানবজীবনের অনিবার্য, অলঙ্ঘ ভবিতব্য হল মহামারি, যত কায়দা-কানুন, ফন্দি-ফিকিরই করোনা কেন, সে আসবেই।কেন? না কামুর কথায়,”The next plague would rouse up its rats again for the bane and enlightenment of men.”

উপন্যাসের পটভূমি অ্যালজিয়ার্সের সমুদ্র-উপকূলবর্তী একটি ছোট শহর, নাম ‘ ওরান’।উপন্যাসের কাহিনীর কথক আছেন একজন যাঁর নাম শুরুতে গোপন রাখা হলেও উপসংহার-পর্বে পরিষ্কার হয়ে যায়।অবশ্য যে কোনও মনোযোগী পাঠকই কাহিনী একটু গড়ালেই বুঝতে পারেন নেপথ্যের ভাষ্যকারটি কে।তিনি ওরানেরই বাসিন্দা, পেশায় ডাক্তার, স্বল্পবাক, শহরে প্লেগের সন্ধান মেলার অব্যবহিত পর থেকেই যিনি দিবা-রাত্র চিকিৎসা করে গিয়েছেন, পাশের শহরে স্যানিটোরিয়ামে মৃত্যুশয্যায় শুয়ে থাকা সহধর্মিনীকে একটিবার দেখতে যাওয়ার সুযোগও পাননি।এই ডাক্তারবাবুই কাহিনীর কথক, নায়কও বটে। তাঁর মুখ দিয়ে আলবেয়ার কামু কেবল মহামারির বীভৎসার বর্ণনা দেননি, মনুষ্য-জীবনের গভীরতম উপলব্ধিগুলিকেও আমাদের চোখের সামনে বে-আব্রু করে দিয়েছেন। কথকের নাম বার্নার্ড রিউক্স।

কেমন শহর ‘ ওরান’? সমুদ্র আছে কিন্তু গাছপালা, সবুজের স্পর্শ বিশেষ একটা নেই।শহরের মানুষগুলো কেমন? সত্যি বলছি কামুর নির্লিপ্ত, সংক্ষিপ্ত বিবরণ পড়ে গুজুভাই আর মাড়োয়াড়িদের কথা মনে পড়ল আমার।শহরের বাসিন্দারা সবাই বেশ পরিশ্রমী, তাদের জীবনের একমাত্র লক্ষ্য হল বড়লোক হওয়া।” Their chief interest is in commerce and their chief aim in life is, as they call it ‘doing business!” কোন দেবতার অভিশাপের কারণে বলতে পারবনা, এহেন লক্ষ্মীর বরপুত্রদের শহরের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য-বৈভবকে ফালাফালা করে দিতে অতর্কিতে হানা দিল প্লেগ।

কাহিনীর কথক ডাঃ বার্নার্ড রিউক্স তা প্রথম টের পেলেন দোতলায় নিজের ফ্ল্যাটে ওঠার সময়, দেখলেন গোটা দুয়েক ইঁদুর খাবি খাচ্ছে একতলায় মেঝের ওপর, তাদের নাসারন্ধ্র দিয়ে বের হচ্ছে বিন্দু বিন্দু রক্ত।তারপর চকিতে শহরের সব মহল্লা থেকে আসতে শুরু করল মরা ইঁদুরের পড়ে থাকার খবর, শয়ে শয়ে, হাজারে, হাজারে।ওরানবাসী দুষলেন পুরকর্তাদের, এটা যে মহা-সর্বনাশের অশনি সঙ্কেত তারা তা বুঝতেই পারলনা।বার্নার্ড কিন্তু ঠিক পারলেন।তিনি সময় নষ্ট না করে শহরের প্রশাসনের কেষ্টবিষ্টুদের ঠান্ডা মাথায় বোঝানোর চেষ্টা করলেন, বিপদের এই সঙ্কেত মোটেই হাল্কাভাবে নেওয়ার নয়।

উচিত পরামর্শে কর্ণপাত করারও প্রয়োজন বোধ করলেননা তাঁরা।কেউ বললেন, ইউরোপ থেকে প্লেগ নির্মূল হয়ে গিয়েছে অনেককাল হল, অবাস্তব কথা ভেবে লোক হাসানোর অর্থ হয়না।রিউক্সের একজন ডাক্তার বন্ধু অভয় দিলেন, এটা হয়ত নতুন ধরণের একটা জ্বর, এ নিয়ে ভয় পাওয়ার কোনও কারণ নেই।শহরের সর্বময় দন্ডমুন্ডের কর্তা ‘ প্রিফেক্ট’ সব শুনে পরিষ্কার বলে দিলেন,’ ডোন্ট রিং দ্য অ্যালার্ম বেল।শহরের লোকজনকে মিছিমিছি ভয় পাইয়ে দেওয়ার কোনও অর্থ হয়না। রিউক্স প্রতিবাদ করলেননা, মনে মনে ভাবলেন, এই আত্ম-সন্তুষ্টি বেশি দিন স্থায়ী হওয়ার নয়, কাল নতুবা পরশু এরাই নিজেদের অভিমত বদলাবেন। কেবল প্রস্তুতি নিতে দেরি হয়ে যাবে এই যা।

কাট টু ২০১৯।চিনের ইউহানের এক ডাক্তারবাবু প্রথম সন্ধান পেলেন করোনা ভইরাসের, সহকর্মীদের সতর্ক করলেন, উপরমহলে জানিয়েও দিলেন নিজের দুশ্চিন্তার কথা। অচিরে সেই সংবাদ ছড়িয়ে পড়ল গোটা দুনিয়ায়। ফলটা কী হল? ১৯৪০-এর ওরানে শহরের মাথারা যেমন কুছ পরোয়া নেই ভাব দেখিয়েছিলেন, আশি বছর পরে সেই একই প্রাথমিক প্রতিক্রিয়ায় কোনও ব্যত্যয় দেখা গেল কি? বিপ্লবী চিনা কর্তৃপক্ষ তাদের ডাক্তারবাবুকে ইনাম দিলেন সোজা গারদে পুড়ে দিয়ে আর বাকি বিশ্ব স্থবির হয়ে বসে রইল দুর্যোগের আগাম বার্তা শুনেও। যে যার মতো করে ষড়যন্ত্রের কল্প-কাহিনী বাজারে ছাড়তে শুরু করলেন আর পাগলা দাশুর নয়া অবতার মার্কিন প্রেসিডেন্ট মশা তাড়ানোর ভঙ্গিতে হোয়াইট হাউসের সবুজ গালচের ওপর দাঁড়িয়ে হাওয়ায় উড়তে থাকা গলার টাই-টা সামলাতে সামলাতে বললেন, ‘That is a Chinese virus, we need not bother about it’

সময় থাকতে ব্যবস্থা না নেওয়ার যে খেসারত একদা অ্যালজিয়ার্সের একটা ছোট শহরকে দিতে হয়েছিল, এখন তাই দিতে হচ্ছে কম বেশি প্রায় প্রত্যেকটি দেশকে। সবচেয়ে মর্মান্তিক হাল হয়েছে সর্বশক্তিধর আমেরিকার। চাইনিজ ভাইরাস এখন বিচুটি পাতা হয়ে হোয়াইট হাউসে বীর বিক্রমে ঢুকে পড়েছে, রোজ গড়ে হাজার মানুষের মৃত্যু হচ্ছে মার্কিন মুলুকে, নির্বাচনের বছরে এমন অপ্রত্যাশিত আপদের মুখে দিশেহারা প্রেসিডেন্ট বুঝেই উঠতে পারছেননা, কীভাবে এই বিপর্যয়ের মোকাবিলা করবেন।যে আমেরিকা ইচ্ছে করলে কয়েক হাজার মাইল দূরে বসে স্রেফ একটা বোতাম টিপে অব্যর্থ লক্ষ্যে বোমা ফেলতে পারে, সামান্য ‘ চাইনিজ ভাইরাস’ এখন তাকে রোজ কান ধরে ওঠ-বোস করাচ্ছে।পাগলা দাশু কখনও চিনকে চমকানোর চেষ্টা করছেন, পরক্ষণেই আবার আনাড়ি পরামর্শদাতার কথা শুনে নরেন্দ্র মোদীকে টেলিফোন করে হুকুম দিচ্ছেন, ‘এক্ষুনি উড়োজাহাজ বোঝাই করে কুইনাইন পাঠাও নইলে তোমাকেও দেখে নেব’, কখনও আবার স্বজাতিকে প্রেসক্রিপশন দিচ্ছেন, ঠা ঠা রোদের তলায় কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকুন, দেখবেন ভাইরাস ভাগলবা হয়ে গিয়েছে। সেটা যদি সম্ভব না হয় গোটা গায়ে বেশ করে বীজনাশক মাখুন, ভাইরাস আপনার ফুসফুসের বদলে শরীরের অন্য কোনও ছিদ্র খুঁজবে পালিয়ে বাঁচার জন্য। সব মিলিয়ে গোটা বিশ্ব-জুড়েই এখন করোনার ভয়ঙ্কর ত্রাস, শেয়ার বাজারের তালিকার মতো করে মানুষের লাশের হিসেব টাঙিয়ে দেওয়া হচ্ছে যেখানে সেখানে- মরল এত, রোগ ধরা পড়ল এত, উপসর্গহীন অথচ ভাইরাসবাহীর সংখ্যা এত এবং চিকিৎসায় সাড়া দিয়ে এ যাত্রায় বেঁচে গেল এত।হিংসার মতো মহামারিও যে পৃথ্বীকে উন্মত্ত করে তুলতে পারে, নিত্য নিঠুর দ্বন্দ্বে ভরে যায় আকাশ বাতাস, কদম ফুলের মতো চেহারার একটা ছোট্ট ভইরাস তা দেখিয়ে দিয়েছে প্রতিদিন।

কথায় আছে, লোকে দেখে শেখে নয়তো বা ঠেকে ( আমি অভাগা দু’টোর একটা থেকেও শিখতে পারিনা)।যুদ্ধ কিংবা মহামারির ক্ষেত্রে সেটা হয়না কেন? আলবেয়ার কামু বলছেন ব্যক্তির মতো মানবজাতিও বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে একই ভুল করে বসে থাকে বারংবার। তাঁর কথায়,’ This under reaction is far worse than over reaction. It is a universal human frailty. Everybody knows that pestilence have a way of recurring in the world, yet somehow we find it hard to believe in ones that crash down on our heads from a blue sky.”

প্রথমে অবিশ্বাসের ‘দূর ছাই’ মনোভাব, তারপর আত্ম-প্রবঞ্চনা, তারপর মাথায় আকাশ ভেঙে পড়া, অবশেষে বিপর্যয়ের কাছে নির্মম সমর্পণ।মরা ইঁদুরের প্রথম সন্ধান পাওয়া থেকে বেওয়ারিশ লাশ হওয়ার মধ্যে এইভাবেই যেন বদলাতে থাকে ওরানবাসীর মনোভাব।নিচু লয়ে শুরু হয়ে ক্রমশ থ্রিলারের অবয়ব নেয় কামুর এই কাহিনী, পড়তে পড়তে রোমকূপ খাড়া হয়ে ওঠে।অতি-কথনের লেশমাত্র নেই, নেই অনাবশ্যক নাটুকেপনা, গভীর বিষাদের কাহিনী আগাগোড়া কোমল লয়ে বাঁধা।এরই মাঝে থেকে থেকেই ঊঁকি মারতে থাকে জীবন আর জীবনবোধের সারসত্যগুলো যা আমরা জেনেশুনে তবু ভুলে থাকি।পদ্মপাতায় জলের মতো টলমলে জীবনের অনিশ্চয়তা তবু জীবন বড় সুন্দর, বড় উপভোগ্য, বড় রমণীয়! সবার ওপরে মানবতার অভ্রভেদী ধ্বজা।

ওরানে প্লেগের প্রথম চরণ-চিহ্ণ দেখা যায় বসন্তে, শহরের এখান-সেখান থেকে আসতে থাকে একটা-দুটো করে মানুষের মৃত্যুর খবর।শহরবাসী ভাবেন, ও কিছু নয়, কিছুদিন সময় গেলেই সবকিছু আবার স্বাভাবিক হয়ে যাবে। হয়না।সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়েই যেন বাড়তে থাকে মৃতের সংখ্যা। গ্রীষ্ম এলে দেখা যায় গড়ে দিনে মৃতের সংখ্যা একশ ছাড়িয়ে গিয়েছে।তার আগেই অবশ্য শহরের দরজাগুলোয় তালা ঝুলিয়ে দেওয়া হয়েছে, বসানো হয়েছে চব্বিশ ঘন্টার সশস্ত্র প্রহরা, অন্দর-বাহার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।

প্লেগ মাথাচাড়া দেওয়ার আগে প্যারিস থেকে ওরানে খবরের সন্ধানে এসেছিল সদ্য-বিবাহিত এক সাংবাদিক যুবা, অবরুদ্ধ শহরে সে-ও আটকা পড়ে যায়।কর্তাব্যক্তিদের দরজায় দরজায় সে মাথা খুঁড়ে মরে, সমাজবিরোধীদের সাহায্য নিয়ে পুলিশকে ঘুষ দিয়ে গভীর রাতে দরজা খোলানোর চেষ্টা করে, কিছুতেই সফল হয়

না। অবশেষে তার নামে একটা ছাড়পত্র লিখে দেওয়ার আবেদন নিয়ে সে পৌঁছে যায় বার্নার্ড রিউক্সের চেম্বারে। ডাক্তারবাবু তাতে সায় দিতে পারেননা, উল্টে শুনিয়ে দেন তার মতো একই রকম অসহায় অবস্থায় অবরুদ্ধ ওরানে রয়ে গেছেন আরও অসংখ্য মানুষ। স্ত্রীর তীব্র বিরহ-বেদনা ধীরে ধীরে কাটিয়ে উঠে সেই সাংবাদিকও বুঝতে পারে সুখের মতো দুঃখকেও বাঁটোয়ারা করে নিতে জানতে হয়।বাড়ি ফেরার কথা বেমালুম ভুলে গিয়ে সেই সাংবাদিক ভিড়ে যায় স্বেচ্ছাসেবকদের দলে। কেন? না কামুর ভাষায়,” What is true for all evils in the world is also true for plague as well. It helps men to rise above themselves.”

তার মানে বিপর্যয়ের মুখে পড়ে দু’টি বিপরীতধর্মী প্রতিক্রিয়া সমান্তরালভাবে কাজ করে চলেছে মানুষের মনে। এবং একই রকম সত্য দুটোই।একদল মানুষ যখন রোগের ছোঁয়া থেকে বাঁচতে নিকটাত্মীয়কেও সামনে আসতে দিতে ভয় পাচ্ছে, একাকীত্ব, একঘেয়েমি আর বিচ্ছেদ-বেদনা-ক্লিষ্ট নির্বাসিত জীবনে ভয় আর স্বাভাবিক আতঙ্কের কাছে মাথা নোয়াচ্ছে, অন্যদিকে আর একদল মানুষ তখন জীবনকে বাজি রেখে স্বতঃস্ফূর্তভাবে নেমে পড়ছেন আর্তের সেবায়, তাঁদের মধ্যে কেউ রাত জেগে পাহারা দিচ্ছেন ইস্কুল বাড়িতে তৈরি হওয়া আইসোলেশন সেন্টার, কেউ ডিউটি দিচ্ছেন কবরখানায়, কেউ আবার প্লেগ-রোগীদের মাঝেই হুকুম তামিল করে চলেছেন ডাক্তারবাবুদের।

এই স্বেচ্ছা-সেনানীদের আমরা দেখতে পাচ্ছি করোনার বাজারেও। আম-জনতার কাছে তাঁরা হিরোর সম্ভ্রম আদায় করে নিচ্ছেন।কিন্তু কামুর উপন্যাসের নায়ক রিউক্স যিনি প্লেগের সূচনা থেকে বিদায় পর্যন্ত অক্লান্তভাবে কেবল নীরবে পীড়িতের সেবা করে গিয়েছেন তিনি আদৌ তা মনে করেননা। তিনি মনে করেন, “This whole thing is not about heroism. It may sound like a ridiculous idea but the only way to fight the plague is with decency. তাঁকে যখন একজন জিজ্ঞেস করেন ‘ ডিসেন্সি’ বলতে তিনি ঠিক কী বোঝেন, রিউক্স উত্তর দেন, ‘আমার কাজটা নিষ্ঠার সঙ্গে করে যাওয়া।’

হতে পারে এমন ভদ্রতাবোধের উৎসে আছে জীবন সম্পর্কে গভীরতর আর একটি উপলব্ধি। তা হল, “ Being alive always was and will always remain an emergency, it is truly an inescapable underlying condition” কামুর কাছে এটাই হল absurdity of life.

তাই বলে কি এই উপলব্ধি থেকে হতাশাই কেবল জন্ম নেবে? আদপে নয়।বরং এই উপলব্ধি হলে হৃদয় শান্ত হবে, জাগ্রত হবে আনন্দ আর মানুষের প্রতি কৃতজ্ঞতাবোধ।পাঠককে ভয় পাইয়ে দেওয়াটা এই উপন্যাসের লক্ষ্য নয়, কেননা ভয়ের মানে হল একটা সাময়িক আপৎকালীনঅবস্থায় সুরক্ষার সন্ধান।কিন্তু সুরক্ষা বা নিরাপত্তা শেষ পর্যন্ত একটা অলীক কল্পনা ব্যতীত আর কিছু নয়। Life is a hospice, never a hospital।

সব কিছুরই একটা শেষ থাকে, শেষ থাকে সর্বনাশেরও।ওরান শহরও একদিন প্লেগমুক্ত হয়, উন্মুক্ত হয় বন্ধ দরজা, বন্দরে আবার জাহাজ এসে নোংরা করে।স্বজন বিয়োগের বেদনা ভুলে গিয়ে শহরবাসী ফের মেতে ওঠে উন্মত্ত আনন্দে, দোকানপাট খোলে, পানশালায় ভিড় উপচে পড়ে, এতদিন শ্মশানের নীরবতা নিয়ে পড়ে থাকা ধূ ধূ বালুকাবেলা আবার কোলাহল মুখরিত হয়ে ওঠে, রাস্তায় গভীর আশ্লিষ্ট চুম্বনে প্লেগের দুঃস্বপ্ন ভুলতে চায় প্রেমিক যুগল। তার আগেই স্ত্রীর মৃত্যু সংবাদ পেয়ে গিয়েছেন বার্নার্ড কিন্তু ভেঙে পড়েননি। সামান্য দূরত্বে দাঁড়িয়ে তিনিও শরিক হন শহরবাসীর আনন্দের, বহুদিন পরে সাঁতার কাটতে ঝাঁপ দেন সমুদ্রে, একটা সময় শহরের রাস্তায় বাজনার ছন্দে তাঁকেও শরীর দোলাতে দেখা যায়।

তবু বার্নাড বিস্মৃত হতে পারেননা বৃহত্তর সত্যটাকে। তিনি জানেন, “This chronicle could not be a story of definitive victory. It could only be the record of what had to be done and what no doubt would have to be done again against this terror.” কেননা মানুষ মরে কিন্তু প্লেগ মরেনা। সে চুপ করে ঘাপটি মেরে বসে থেকে ধৈর্যের পরীক্ষা দেয়, সকলের অলক্ষ্যে সে বসে থাকে শোয়ার ঘরের তাকে, স্যুটকেসের ভিতরে, পকেটের রুমালে কিংবা পুরোনো কাগজপত্রের ভাঁজে। তারপর একদিন সে অতর্কিতে একইভাবে হানা দেবে অন্য কোথাও, অন্য কোনওখানে।

Leave a comment

Your email address will not be published.