- August 16th, 2022
রবি ঠাকুর না জন্মালে
এই দুষ্প্রাপ্য দৃশ্য কী ভাবে রচিত হত?
সাবিনা ইয়াসমিন
রবি ঠাকুর না জন্মালে আমাদের ছোটবেলায় সাধারণ মুসলিম ফ্যামিলিগুলোতে কিচ্ছু যায় আসত না। কারণ তখন কাজী নজরুল ইসলাম মুসলিম পরিবারগুলোতে ‘রাজ’ করতেন। ভদ্র ভাষায় বলা যায় বিরাজ করতেন। রেডিওতে ‘তোরা দেখে যা আমিনা মায়ের কোলে’ বাজলে নব ঘুরিয়ে আওয়াজটা জোরে দেওয়া হত। রবীন্দ্রনাথের ছবি দেওয়া ক্যালেন্ডার কোনও ভাবে বাড়িতে এসে পড়লে খুব মুশকিল হত। দেওয়ালে ‘ঠাকুর’ এর ছবি টাঙালে গুনাহ হবে....এই সলিড ধর্মীয় কারণে রবি ঠাকুর ঢুকে যেতেন কাঠের আলমারিতে। মুসলিম পরিবারে শুধু ঠাকুর নন, যে কোনও মানব মহামানবের ছবি টাঙানোতেও ভয়ংকর নিষেধাজ্ঞা ছিল।
তখন সেই মুসলিম পরিবারটির কাছে রবি ঠাকুর মানে একজন মানুষ। অতিমানব নন। গান লেখেন। কবিতা লেখেন। গল্প উপন্যাস লেখেন। নোবেলও পেয়েছেন। তাতে কী! রেডিওতে তাঁর গান বাজলে ঘুম লাগে।
ক্যালেন্ডারে রবি ঠাকুরের ছবি দেখে আমার দাদির সে কী আক্ষেপ! ‘কী সোন্দর দাড়ি! ঠিক য্যান পীর পয়গম্বর! গায়ে মোলবি সায়েবের মতুন ঢুলা জামা। সব ঠিক আছিল। কিন্তু মোচখানের জন্য মোসলমান হতে পারল না মানুষটা!’ দাদি মাঝেমাঝে ক্যালেন্ডারটা বের করে রবি ঠাকুরকে দেখতেন আর বলতেন লোকটার মুখে কী য্যান একটা আছে! শান্তি লাগে। ক্যানে যে মোচটা থুতে গেল! ঝুলা মোচখান না থাইকলে এ লোক একেবারে খাঁটি মোসলমান। আমাগো ঘরের লোক।
ইতিমধ্যে বড় ওয়ানে উঠলাম। সহজ পাঠ হাতে এল। এত সহজ ভাবে জীবনের রস গ্রহণ করতে করতে বানান এবং বাক্যগঠনও শেখা যায়! কবিতা নয়, যেন ছবি!
— ‘পথের ধারেতে একখানে/হরি মুদি বসেছে দোকানে
-- বিধু গয়লানী মায়ে পোয়/ সকালবেলায় গোরু দোয়। আঙিনায় কানাই বলাই/ রাশি করে সরিষা কলাই।’ পাশে বসে বুড়ি দাদি ফুটুস করে ফুট কাটেন, ‘এ তো পুরাই হিঁদু পাড়ার বন্ননা! ও ময়না, মোসলমানদের নিয়া কিছু ল্যাখা পেলে শুনাবা।’
আমি পড়ি, ‘বামি ঐ ঘটি নিয়ে যায়। সে মাটি দিয়ে নিজে ঘটি মাজে।’ দাদি বলেন, ‘রোবিন্দনাত পীর মানুষ তো! ঠাকুর। সারাজীবন আল্লার কথা ভেবিছে। তাই ঘর সনসারের কথা ভুলভাল লিখেছে। মাটির সাথে এট্টু ছাই মিশায়ে না মাইজলে ঘটি সুনার মতুন ঝকমকা হওয়া মুশকিল।’ এ সব কথা শুনে আমি বিরক্ত হতাম। মা মুখ টিপে হাসত।
এরপর সংসারে যা হয় ... ভাইয়ে ভাইয়ে ঝামেলা, হাতাহাতি, দায়িত্ব এড়ানোর প্রচেষ্টা... এ সব অশান্তির মাঝখানে বাবা ‘ভেন্ন’ হলো এবং একটা ভাড়া বাড়িতে আমরা উঠে এলাম। তারপর কিছুদিনের মধ্যেই আমাদের নিজের বাড়ি হল। বাগানওয়ালা বাড়ি। আমার মায়ের জীবনে খুশি নেমে এল। রেডিওতে জোরে জোরে ‘প্রাত্যহিকী’ শোনা হত রোজ। প্রাত্যহিকীর পর ১৫ মিনিটের জন্য রবীন্দ্রসঙ্গীতের প্রোগ্রাম হত। বাংলাদেশের শিল্পীদের গাওয়া রবীন্দ্রসঙ্গীতও বাজত সেই অল্পক্ষণের অনুষ্ঠানে। আমার পড়া মুখস্থর সঙ্গে জোরে বাজানো রবীন্দ্রসঙ্গীতের কোনও বিরোধ ঘটত না। মা-ও গলা মেলাত। মা গান না শিখলেও সুর জ্ঞান ভালোই ছিল।
নতুন বাড়িতে ছোট্ট মতো লাইব্রেরি তৈরি হল। রবীন্দ্রনাথ সাড়ম্বরে এলেন। অনেক লেখকের বইয়ের সঙ্গে সঞ্চয়িতা, গীতবিতান, উপন্যাস সমগ্র, ছোটগল্প এল। আরও এল রেকর্ড প্লেয়ার। চারকোনা বক্স। তার উপর গোল রেকর্ড। কালো রঙের। পিন চাপিয়ে গান শুনতে হয়। সারাদিনে রবীন্দ্রসঙ্গীত দু’তিনবার তো বাজতই! হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, সাগর সেন, অর্ঘ্য সেন, সুচিত্রা মিত্র, দেবব্রত বিশ্বাস, সুমিত্রা সেন আমাদের মন ভালো রাখতেন। আরও ছিল সিনেমার গানের রেকর্ড। মণিহার, লালকুঠি সিনেমার গান। সন্ধ্যা মুখার্জির গান। ছিল সিরাজদ্দৌলা নাটক। আমার দাদি আমাদের সঙ্গে থাকতেন না। মাঝে মাঝে এসে এক দু’মাস করে থাকতেন। কাপড় চোপড়ের সঙ্গে জায়নামাজ, তসবিহ...সব আনতেন। আর আনতেন দাড়িওয়ালা ফেরেস্তার ছবিখানা। কেউ জানত না। আমি আর মা-ই শুধু জানতাম। পরে অবশ্য সবাই জেনেছিল।
হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের গলায় ‘রোদনভরা এ বসন্ত’ শুনে দাদির চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ত। রেকর্ডের উল্টো পিঠে ছিল ‘রাঙিয়ে দিয়ে যাও’... সেটা শুনেও কাঁদতেন। ‘মোর ভাবনারে কী হাওয়ায় মাতালো’র দুর্দান্ত মিউজিকে আমি যখন মাথায় গামছা বেঁধে নকল খোঁপা বানিয়ে ধিতিং ধিতিং করে নাচতাম, দাদি দেওয়ালে হেলান দিয়ে বসে উদাস ভাবে অন্যদিকের দেওয়ালটার দিকে তাকিয়ে থাকত।
চোখ দিয়ে অবিশ্রান্ত অশ্রু ঝরত। গানের সব কথার মানে যে ঠিকমতো বুঝতেন না, সেটা আমার মতো বাচ্চা মেয়েও বুঝতে পারত। এক দাড়িওয়ালা পীর টাইপের মানুষের সঙ্গে এই গানগুলো জুড়ে দিয়ে আমার নিরক্ষর দাদি কখন যেন তাঁকে নিভৃত প্রাণের দেবতা বানিয়ে ফেলেছিলেন নিজের অজান্তেই। নইলে যে বার বাবার ভয়ঙ্কর টাইফয়েড হল, তখন দাদি কেন নামাজ শেষ করে বাবার মাথার কাছে দাঁড়িয়ে দোয়া পড়ে গায়ে মাথায় ফুঁ দিতেন আর গোল করে পাকানো রবি ঠাকুরের ছবিওয়ালা ক্যালেন্ডারটি বাবার মাথায় স্পর্শ করাতেন?
দাদির মৃত্যুর সময় ছেলের বউরা চামচে করে বেদানার রস আর জমজমের পানি খাওয়াচ্ছিল। অশীতিপর বৃদ্ধার মুখ থেকে বাইরের দিকে গড়িয়ে পড়ে গিয়েছিল সব তরল। গেলবার শক্তিটুকুও ছিল না। অথচ হাতের মুঠোয় মুড়িয়ে রাখা রবি ঠাকুরের ছবি ছাপা সেই ক্যালেন্ডারটি শক্ত করে ধরে রেখে ছিলেন। ঘরে উপস্থিত সবাই ক্ষীণস্বরে লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ বিড় বিড় করছিল। দাদি আমার মায়ের দিকে ঘোলাটে চোখে তাকানোর চেষ্টা করে কী যেন বলার চেষ্টা করছিলেন। একবার নয়। বার বার। ঘরে উপস্থিত থাকা মানুষগুলো দোয়া পড়ার আওয়াজ বাড়িয়ে দিয়েও বুড়িকে শান্ত করতে পারছিল না। দাদি একভাবে মায়ের দিকে তাকিয়ে ডান হাতের কাঠির মত তর্জনিটা নাড়িয়ে কাঁপিয়ে চলেছিলেন। মা কি বুঝল জানি না। বাবাকে একদিকে ডেকে কিছু একটা বলতেই বাবা সবাইকে বুঝিয়ে বাইরে নিয়ে গেল। ব্যাপারটা সহজ ছিল না। গ্রামেগঞ্জে মৃত্যু চাক্ষুষ করা একটা নিয়মের মধ্যেই পড়ে। ক্লাইম্যাক্স মুহূর্তে আত্মীয় এবং প্রতিবেশীরা ভীষণ বিরক্ত হয়ে বাইরে উঠোনে গিয়ে দাঁড়াল। তখন ঘরে মা, আমি আর আমার দাদি। দরজা বন্ধ করে মা দাদির খুব কাছে গিয়ে কানের কাছে মুখ লাগিয়ে গাইতে শুরু করলো....রোদন ভরা এ বসন্ত, সখী কখনো আসেনি বুঝি আগে....
মায়েরও চোখ বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে। মা-কে কাঁদতে দেখে আমিও কাঁদছি। সে এক মুহূর্ত বটে!
দক্ষিণসমীরে দূর গগনে...মা থেমে গেল। দাদির চোখের জল আঁচলের খুঁট দিয়ে মুছিয়ে দিয়ে চোখের পাতা দুটো বুজিয়ে দিল। হাতের মুঠো থেকে গোল করে জড়ানো ক্যালেন্ডারখানা ছাড়িয়ে নিয়ে পুরোনো আলমারির ভিতরে তুলে রেখে দরজা খুলে দিল।
রবি ঠাকুর না জন্মালে এই দুষ্প্রাপ্য দৃশ্য কী ভাবে রচিত হত?
রবি ঠাকুরের কাছে পৌঁছতে গেলে কত পড়াশোনা লাগে! সাধনা লাগে। আলাদা করে মনটাকে তৈরি করতে হয়। কিন্তু যার কাছে রবীন্দ্রনাথ নিজে পৌঁছে যান, তার কেবল ভালোবাসা দিতে লাগে।


Arts and Literature
Bioscope
Columns
Green Field
Health World
Interviews
Investigation
Live Life King Size
Man-Woman
Memoir
Mind Matters
News
No Harm Knowing
Personal History
Real Simple
Save to Live
Suman Nama
Today in History
Translation
Trivia
Who Why What How

