- August 13th, 2022
হেঁটে দেখতে শিখুন
শুভেন্দু দেবনাথ
“মেজাজটাই তো আসল রাজা আমি রাজা নই”। স্ত্রী সিনেমার এই গানের কলি কিন্তু একদম সার সত্য জানিয়ে দেয় বড় মানুষের। কিন্তু এর পিছনেও একটা বড় সত্যি লুকিয়ে রয়েছে, যা আমরা সকলেই জানি কিন্তু খেয়াল করি না। আর সেই সত্যিটাও কিন্তু একেবারে এড়িয়ে যাওয়ার নয়। এই সত্যিটা টেকনিক্যাল। ছবিটি যখন আমরা দেখছি আমাদের মস্তিস্ক জানে পিছনে মান্না দে গাইছেন, কিন্তু মন বলছে গাইছেন আসলে উত্তমকুমার। সত্যিটা হল মান্না দের কণ্ঠে লিপ মেলাচ্ছেন মহানায়ক।
করোনার কাজ করতে গিয়েও তেমনটাই দেখেছি। এই যে করোনা আবহে ভোট, তাতে আঞ্চলিক রাজাদের মনোকষ্ট, তারা কাজ করতে পারছেন না বলে নিজেদের পুরোনো রাজ্য ছেড়ে নতুন রাজ্যে যোগ দিলেন, কাজ করবেন বলে চিৎকার চেঁচামেচি করলেন, কিন্তু ভোট মিটতেই তাদের কাজের ইচ্ছেটাও হাওয়া হয়ে গেল। কিন্তু যাদের মেজাজটাই রাজা তারা হাত গুটিয়ে বসে থাকতে পারলেন কই? যারা নামে আর ক্ষমতায় রাজা, তারা রইলেন নিরাপদ ঘেরাটোপে। আর যারা ওই কানাছেলের নাম পদ্মলোচন টাইপের, নামে রাজা শুধু তারা চিরকেলে বোকাদের মতো ঝাঁপিয়ে পড়লেন যুদ্ধে।
করোনায় কাজ করতে গিয়ে যখনই বিপদে পড়েছি, সমস্যায় জর্জরিত হয়েছি এই শহরের বুকে তখনই পেয়েছি বেশ কিছু রাজার সন্ধান। যাদের শরীরে শতছিন্ন মলিন পোশাক, কিন্তু মনটা রাজার মতোই উদার। যাদের রাজ্য ছিল না কোনও দিন, কিন্তু গোটা কলকাতাটাই তাদের রাজ্য, তারা মনের রাজা। প্রথম প্রথম কাজ করতে গিয়ে এত অদ্ভুত এবং অমানবিক সমস্যার সামনে দাঁড়িয়েছি যে নিজেকে মনুষ্যপদবাচ্য ভাবতেই লজ্জা লেগেছে। মনে পড়ছে এক দুপুরবেলা দমদমের দেবীনিবাস রোডে ওষুধ পৌঁছতে গেছি একজনের বাড়িতে। প্রচণ্ড গরম, গলা শুকিয়ে কাঠ। রোগীর বাড়ির লোকের কাছে এক গ্লাস জল চাওয়াতে উত্তর আসে ‘আপনারা করোনা ঘাঁটছেন, গ্লাসে জল দেওয়া যাবে না’। প্রত্যুত্তরে বলি তাহলে একটা বোতল দিন। জবাব আসে, ‘আমাদের বাড়িতে বোতল বাড়ন্ত’। আবার দমদম কাজিপাড়া অঞ্চলে রাত ১১টায় ওষুধ পৌঁছতে গিয়ে দরজায় বেলা বাজালে, সে শব্দে পাশের ফ্ল্যাটের দরজা খুলে একজন বেরিয়ে এসে গৃহকর্তাকে জিজ্ঞাসা করেন, ‘ওষুধ পেলেন?’ রোগীর বাড়ির লোকের আমার সামনেই উত্তর, ‘হ্যাঁ দেখুন না ব্ল্যাকে কিনছি’। রাগে অন্ধ হয়ে যখন ওষুধের প্যাকেট ফিরিয়ে নিয়ে ফিরে আসতে যাচ্ছি তখন কাকুতি মিনতি, ‘আসলে অনেক দাম বুঝতেই পারছেন, মাথার ঠিক থাকছে না।’
গত ১৯ মে একটা অক্সিজেন সিলিন্ডার অনেক কষ্টে কিনেছি। কিন্তু ফ্লো মিটার পাচ্ছি না। সেই সময় সাংবাদিক বন্ধু চৈতালী বিশ্বাসকে ফোন করতেই সে একজনের নম্বর দেয়। কোন্নগরের এক ডিলার। তাঁকে ফোন করতেই তিনি বলেন, তাঁর কাছে ফ্লো মিটার আছে, কিন্তু যেহেতু এখন দাম অনেক বেড়ে গিয়েছে ফলে তিনি যে দামে কিনেছেন সেই দামেই আমাকে দেবেন। অন্যান্য জায়গার তুলনায় অনেক কম দাম হওয়ায় সেটি নিতে রাজি হই।
আমাদের এক ভলান্টিয়ার মহেন্দ্র বণিকও কোন্নগরে থাকে। রেডি হয়ে বেরতে যাব সেই সময় মহেন্দ্রর ফোন। মাহিই আমাকে একটা অক্সিজেন সিলিন্ডার জোগাড় করে দিয়েছিল খড়দা থেকে। মাহিকে জানাই ওর ওখানেই যাচ্ছি ফ্লো মিটার আনতে। শুনেই মাহির উত্তর নম্বরটা আমাকে দাও। আমার এক বন্ধু বাগবাজারে থাকে, নম্বর দিচ্ছি ওকে ফোন করো, ও তোমাকে ফ্লো মিটার দিয়ে দেবে আর এখান থেকে আমি তুলে নিচ্ছি, আমাদের লাগবে।
ফোন লাগাই মহেন্দ্রর বন্ধুকে। থাকেন বাগবাজারের কাছে শেঠ পুকুরে। তিনিও একজন ডিলার, কিন্তু আমাদের মতো বহু ভলান্টিয়ারকেই তিনি সাহায্য করেছেন। একটা উবের নিয়ে সোজা পৌঁছে যাই শেঠ পুকুরে। ফোন করে জানাই এসে গিয়েছি, আমাকে দাঁড়াতে বলেন। ব্রিজের ঠিক নীচেই একটা বস্তি অঞ্চল, চারদিকে ট্রাক দাঁড়িয়ে আছে, আশপাশে ড্রাইভাররা আড্ডা মারছে। অনেকক্ষণ পর প্রায় আধো অন্ধকার ফুঁড়ে হাফপ্যান্ট মুখে মাস্ক পরিহিত বয়সে ছোট একটি ছেলে উঠে আসে সামনে হাতে ফ্লো মিটার নিয়ে। দাম জিজ্ঞাসা করতেই সে উত্তর দেয় কোনও পয়সা লাগবে না, শুধু কাজ মিটে গেলে যেন মিটারটি ফিরিয়ে দিই। অবাক হয়ে তাকাই ছেলেটির দিকে।
চারদিকে নোংরা আবর্জনা, ট্রাকের খালাসিদের আড্ডা, অদ্ভুত দর্শন নিচু এবং ছোট ছোট শুয়োরের খোঁয়াড়ের মতো ঘর, চায়ের দোকান, এমন একটা পরিবেশে ছেলেটি যেন এক অদ্ভুত দর্শন দেবদূত। একটা ফ্লো মিটার কিনতে কোন্নগর গেলে দাম-সহ যাতায়াত নিয়ে প্রায় হাজার পাঁচেক টাকা পড়ে যেত। এই মাগ্গিগণ্ডার বাজারে অবলীলায় সাড়ে চার হাজার টাকা রোজগার ছেড়ে দিচ্ছে একটা ছেলে!
কালো মতো ছেলেটি নামেও রাজা, কাজেও। রাজা মণ্ডল। আমাকে যত্ন করে শিখিয়ে দিল কী ভাবে ফ্লো মিটার লাগাতে হবে, তার ফাংশনিং সমস্ত কিছু। ফ্লো মিটারটির মধ্যে রোটামিটার থাকলেও নেই হিউমিডিফায়ার বোতল, যদিও না থাকলেও অসুবিধা কিছু নেই। কিন্তু তবু রাজা জানায়, কাল সে সেটারও ব্যবস্থা করে দেবে আরজি করের সামনে। সেখান থেকে যখন আরজি করের সামনে দিয়ে যাচ্ছি, উবেরের চালককে বলি দাদা একটা বোতল কিনব ফ্লোমিটারের একটু দাঁড়াবেন? আমার কাজ এবং উদ্দেশ্য শুনে তিনি পরিষ্কার জানিয়ে দিলেন তিনি দাঁড়িয়ে আছেন, যতক্ষণ খুশি লাগুক যেন আমি ওটা খুঁজে কিনে আনি। প্রায় ৪৫ মিনিট ধরে আরজি করের সমস্ত ওষুধের দোকান আতিপাতি করে খুঁজেও আমি হিউমিডিফায়ার না পেয়ে গরমে ঘেমে উঠি। রাজাকে ফোনে জানাই। সে বলে চিন্তা নেই সকালেই আমি জোগাড় করে দেব। উবেরে ফিরে আসায় চালকটি বলেন, ‘পেলেন না? আর কোথাও দেখবেন? দেখুন না আমি দাঁড়াচ্ছি। এক্সট্রা চার্জ দিতে হবে না আপনাকে। তাকে বলি এই রাতে একমাত্র কলেজস্ট্রিট ছাড়া আর কোথাও পাওয়া যাবে না। চালকটি বলেন, ‘আপনি রাইড ক্যানসেল করে দিন। যে টাকাটা দেখাচ্ছে সেটাই আমাকে দেবেন। আমি আপনাকে কলেজস্ট্রিট নিয়ে যাচ্ছি আবার বাড়িও ফিরিয়ে দেব। আর কোনও টাকা দিতে হবে না আপনাকে। আপনি মানুষের জন্য এত করছেন!’ হাঁ হয়ে যাই, প্রথমে রাজা, পরে এই উবের চালকটি।
কী বলব একে? আমাদের দেশের সিংহাসনে যে রাজা বসে আছেন আর মাটির এই রাজার মধ্যে আকাশ পাতাল ফারাক! অনায়াসে সে ৪৫০০ টাকা রোজগার করতে পারত, কিন্তু তা না করে কতগুলো মানুষ শ্বাস নেবে বলে হেলায় বিলিয়ে দিল এখন মহার্ঘ্য হয়ে ওঠা এই ফ্লো মিটার। নিজের শ্বাসবায়ুও যেন সে ভরে দিল ওই ফ্লো মিটারটার মধ্যে যাতে আরেক রোগী প্রাণভরে নিঃশ্বাস নিতে পারে। অন্যদিকে উবের চালক যে তেল পুরিয়ে আরজি কর থেকে কলেজস্ট্রিট যাবে, আবার সেখান থেকে আমাকে দমদমের মতিঝিলে ফিরিয়ে নিয়ে যাবে, তার জন্য কোনও এক্সট্রা টাকাই নেবে না! অদ্ভুত লাগে। কেউ জল দেয় না, কেউ ব্ল্যাকার বলে দাগিয়ে দেয় শহুরে শিক্ষিত, ভদ্রবেশী মানুষ! আর এরা তথাকথিত সমাজের নিচুতলার মানুষরা অনায়াসে বিলিয়ে দিচ্ছে নিজেদের রোজগার। মনে হয় আমার শহর শেষ হয়ে যায়নি, তিলোত্তমা রূপসী আছে আগেও যেমন ছিল। ওই যে মৃত্যুর আগে শঙ্খবাবু বলে গিয়েছিলেন,
‘তাই। সব অমাত্য পাত্রমিত্র এই বিলাপে খুশী
শুঁড়িখানাই কেবল সত্য, আর তো সবই ভূষি
ছি ছি হায় বেচারা’
ছি ছি হায় বেচারা? শুনুন যাঁরা মস্ত পরিত্রাতা
এ কলকাতার মধ্যে আছে আরেকটা কলকাতা
হেঁটে দেখতে শিখুন’


Arts and Literature
Bioscope
Columns
Green Field
Health World
Interviews
Investigation
Live Life King Size
Man-Woman
Memoir
Mind Matters
News
No Harm Knowing
Personal History
Real Simple
Save to Live
Suman Nama
Today in History
Translation
Trivia
Who Why What How

